OrdinaryITPostAd

''সন্তানের সহিত পিতা-মাতার সম্পর্ক '' তা জানুন!!!

প্রতিটি সন্তানের জন্য পিতা-মাতাই হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সাধারণত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে শুরু করে বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই পিতা-মাতার চারিত্রিক গুণাবলীগুলো শেখার চেষ্টা করে। যার কারণে শিশুকাল থেকেই পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠার দরুন একটি শিশু নিজেকে নিরাপদ বোধ করে। প্রতিটি শিশু তাদের জীবনের প্রথমদিকে নিজেকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে, পরবর্তী জীবনে তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের আচরণগত সমস্যা এবং সম্পর্কজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। আজকের এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে সন্তানের সহিত পিতা-মাতার সম্পর্ক কেমন হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব।



''সন্তানের সহিত পিতা-মাতার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত'' তা জানুন!!!



মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবী সৃষ্টির আদ্যপ্রান্ত থেকেই মানবজাতির বংশবৃদ্ধির জন্য মায়ের গর্ভে দিয়েছেন সন্তান-সন্তুতি। আর এই সন্তানের মাধ্যমে আমাদের প্রকৃতি ও সমাজকে করেছেন আকর্ষণীয়। আমাদের প্রত্যেকের পারিবারিক জীবনে সন্তান যে কতবড় নিয়ামত যার সন্তান নেই তিনি সবচেয়ে বেশি অনুভব করে থাকেন। আল্লাহ তা'য়ালা নেয়ামত হিসেবে যে সকল বান্দার উপর সন্তান দান করেছেন তাদের উপর এক মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পিত হয়েছে। সঠিকভাবে সন্তানকে গড়ে তোলা ও ভালো আদর্শ হিসেবে তৈরি করা সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার জন্য একটি পরীক্ষা। নিম্নে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে ও সামাজিকভাবে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার আদর্শিক সম্পর্ক কেমন থাকা প্রয়োজন নিম্নে কিছুটা তুলে ধরা হ'লঃ-


ইসলামিক দৃষ্টিতে সন্তানের সহিত পিতা-মাতার সম্পর্কঃ

আপনার সন্তানকে প্রথমত ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলাটা একান্ত জরুরী। আপনারা হয়তো লক্ষ্য করবেন আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি দিন দিন যত দ্রুত পরিবর্তনশীল তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সন্তানদের প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখাশোনা করতে হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেখানো পথে সন্তানকে লালন-পালন করে গড়ে তোলা আমাদের প্রত্যেকের ঈমানী দায়িত্ব। আপনার উপর সন্তানের কিছু হক রয়েছে। নিম্নে ইসলামিক দৃষ্টিতে সন্তানের জন্য কিছু হক তুলে ধরা হলোঃ-

১) সন্তান দুনিয়াতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথমে তাকে গোসল দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং তারপর নবজাতক সন্তানের ডান কানে আযান দিন। নবজাতক সন্তানের পিতার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, সন্তানের কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছানো যাতে করে ওত পেতে থাকা শয়তান তার কোন প্রকার ক্ষতি না করতে পারে। হাদিসে এসেছে,
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم «أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلاَةِ».
আবূ রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাসান ইবনে আলীর কানে আযান দিতে দেখেছি [সুনান আবূ দাউদ:৫১০৫]

২) সন্তানের জন্য ইসলামী অর্থবহ সুন্দর নাম পছন্দ করা পিতা-মাতার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। যার কারণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ও অনেক অসুন্দর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। [আবু দাউদ ৪৯৫২-৪৯৬১]

৩) সন্তানের আকীকা করা। ছেলের পক্ষ থেকে ২টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে ১টি ছাগল আল্লাহর নামে যবেহ করা। হাদীসে এসেছে, 
عَنْ سَمُرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ غُلَامٍ رَهِينَةٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ»
সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল নবজাতক তার আক্বিকার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ঐ দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। [সুনান আবূ দাউদ: ২৮৩৮]

৪) ছেলে অথবা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নাত।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান রাঃ এর পক্ষ থেকে ১টি বকরী আকীকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা ! তার মাথা মুন্ডন কর এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ কর। [সুনান আত-তিরমিযী: ১৫১৯]
এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে খেজুর দিয়ে তাহনীক এবং বরকতের জন্য দো‘আ করতেন। [সহীহ বুখারী: ৩৯০৯; মুসলিম: ২১৪৬]

৫) ছেলেদের খাতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নাত। হাদীসে এসেছে,
عَنْ جَابِرٍ قَالَ : «عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ وَخَتَنَهُمَا لِسَبْعَةِ أَيَّامٍ».
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান এবং হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সপ্তম দিবসে আকীকা এবং খাতনা করিয়েছেন। [আল-মু‘জামুল আওসাত: ৬৭০৮]

৬) শিশু যখন কথা বলা শুরু করবে ঠিক তখন থেকেই আল্লাহর তাওহীদ শিক্ষা দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেন,
«يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ، احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ»
‘হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিখাতে চাই। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, আল্লাহও তোমার হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, তুমি তাঁকে সর্বদা সামনে পাবে। যখন কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সহযোগিতা চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখ! যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন উপকার করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলমের লিখা শেষ হয়েছে এবং কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে। [তিরমিযী: ২৫১৬]

৭) ছোট বেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করা ফরয। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও। [জামিউল কাবীর]
কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ»
‘‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।’’ [সহীহ বুখারী:৫০২৭]

৮) সালাত শিক্ষা দেয়া ও সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করা সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক কাজ। তাই, পিতা-মাতা তার সন্তানকে সালাত শিক্ষা দিবেন এবং সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করাবেন। হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ»
আমর ইবনে শূয়াইব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাবা তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সালাতের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য মৃদু প্রহার কর এবং শোয়ার স্থানে ভিন্নতা আনো। [সুনান আবূ দাউদ: ৪৯৫]

৯) আপনার সন্তানকে নৈতিক আচরণ শিক্ষা দেয়া সন্তানের জন্মদাতা হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বললেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তোমার আওয়াজ নীচু কর; নিশ্চয় সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল গাধার আওয়াজ।’ [ সূরা লুকমান ১৮,১৯]

১০) সন্তানদেরকে স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসা দেয়া একান্ত নৈতিক কর্তব্য।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস রাদিয়াল্লাহু আনহুও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমারতো দশটি সন্তান কিন্তু আমিতো কখনো আমার সন্তানদেরকে আদর স্নেহ করিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যে অন্যের প্রতি রহম করে-না আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না। [সহীহ বুখারী: ৫৯৯৭]

১১) পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে দ্বীনের পথে, কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালনা করা, দ্বীনের বিধান পালনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ত করে তোলা। কুরআনে এসেছে,
﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨﴾ [يوسف:108]
‘ বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত নই’। [সূরা ইউসুফ : ১০৮]

সন্তানকে দ্বীনের পথে পরিচালনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
«فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
তোমার মাধ্যমে একজনও যদি হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা হবে তোমার জন্য লালবর্ণের অতি মূল্যবান উট থেকেও উত্তম। [সহীহ বুখারী]

আপনার সন্তানকে দীনি ইলম শিক্ষা দেয়া ফরজ করা হয়েছে। কারণ দ্বীনি ইলম না জানা থাকলে সে বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে। হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ : «طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞানার্জন করা ফরয। [সুনান ইবন মাজাহ: ২২৪]

১২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানকে লালন-পালন করা পিতামাতার নৈতিক কর্তব্য। তাই, সন্তানদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে।
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ لِي مِنْ أَجْرٍ فِي بَنِي أَبِي سَلَمَةَ أَنْ أُنْفِقَ عَلَيْهِمْ وَلَسْتُ بِتَارِكَتِهِمْ هَكَذَا وَهَكَذَا إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ قَالَ: «نَعَمْ لَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ»
উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম আবূ সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি এতে কি আমার জন্য প্রতিদান রয়েছে? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যতদিন তুমি খরচ করবে ততদিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে। [সহীহ বুখারী: ৫৩৬৯]

১৩) আপনার সন্তানদের সক্ষম করে গড়ে তোলাটা একান্ত জরুরি। সন্তানদেরকে এমনভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলা উচিত, যাতে করে তারা উপার্জন করার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এভাবে বলেছেন,
«إِنَّكَ أَنْ تَدَعَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ فِي أَيْدِيهِمْ»
তোমাদের সন্তান সন্ততিদেরকে সক্ষম ও সাবলম্বি রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। [সহীহ বুখারী:১২৯৫]

১৪) সন্তানকে উপযুক্ত বয়সে বিবাহ দেয়া পিতা-মাতার একান্ত কর্তব্য। সুন্নাহ পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়া এবং বিবাহর যাবতীয় কার্য সম্পাদন করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহর ব্যবস্থা করা। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই পিতার উপর সন্তানের হকের মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দেবে। [জামিউল কাবীর]

১৫) সন্তানদের সাথে ইনসাফ করা পিতা-মাতার নৈতিক কর্তব্য। হ্যাঁ ভালো আছিস তো সন্তানগণ পিতামাতার কাছ থেকে ইনসাফ আশা করে এবং তাদের মাঝে ইনসাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তাদের মাঝে ইনসাফ করো’। [সহীহ বুখারী: ২৫৮৭] 

১৬) সন্তানকে ইসলাম অনুমোদন করেনা এমন কাজ থেকে বিরত রাখা এখন তো জরুরী। ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে তাদেরকে বিরত না রাখলে এই সন্তানগনই রোজ কিয়ামাতে পিতামাতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কুরআনে এসেছে,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا ﴾ [التحريم:6]
হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। [সূরা আত-তাহরীম-৬]
﴿وَقَالَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ رَبَّنَآ أَرِنَا ٱلَّذَيۡنِ أَضَلَّانَا مِنَ ٱلۡجِنِّ وَٱلۡإِنسِ نَجۡعَلۡهُمَا تَحۡتَ أَقۡدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ ٱلۡأَسۡفَلِينَ ٢٩﴾ [فصلت: 29]
আর কাফিররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নীচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [সূরা হা-মীম আসসিজদাহ-২৯ ]

১৭) পাপকাজ, অশ্লিলতা, বেহায়াপনা থেকে সন্তানকে বিরত রাখার নৈতিক দায়িত্ব পিতা-মাতার। সন্তান দুনিয়ায় আসার সাথে সাথেই শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং ভিন্ন ভিন্ন রুপে,পোশাক-পরিচ্ছেদের মাধ্যমে, বিভিন্ন ফ্যাশনে, বিভিন্ন ডিজাইনে, বিভিন্ন শিক্ষার নামে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাই পিতা-মাতাকে অবশ্যই এই বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ مِنۡ أَزۡوَٰجِكُمۡ وَأَوۡلَٰدِكُمۡ عَدُوّٗا لَّكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُمۡۚ وَإِن تَعۡفُواْ وَتَصۡفَحُواْ وَتَغۡفِرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٌ ١٤ ﴾ [التغابن:14]
হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর যদি তোমরা মার্জনা কর, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। [সূরা তাগাবুন-১৪]
হাদীসে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا ، قَالَ : «لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ»
ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন। [সহীহ বুখারী:৫৮৮৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم « مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ».
‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সা-দৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। [সুনান আবূ দাউদ:৪০৩১]

১৮) আমাদের সন্তানদের জন্য অবশ্যই দো‘আ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে,
﴿ وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ ﴾ [الفرقان: 74]
আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। [সূরা আলফুরকান-৭৪]
যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিকট দো‘আ করেছিলেন,
﴿ هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبۡ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٗ طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ٣٨ ﴾ [ آل عمران:38]
‘হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’। [সূরা আলে ইমরান ৩৮]
সম্মানিত পিতামাতাবৃন্দ, আমরা কি সন্তানের হকগুলো পালন করতে পেরেছি বা পারছি ? আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদেরকে নেকসন্তান হিসাবে গড়ে তুলি। যে সম্পর্কে হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ»



 সামাজিকভাবে সন্তানের সহিত পিতা-মাতার সম্পর্কঃ

১) সন্তানের সাথে পিতা-মাতার নিবিড় সম্পর্ক ও সংযোগ স্থাপন করতে হবে। শিশুরা সাধারণত জৈব রাসায়নিক স্তরে অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সক্রিয় ও শক্তিশালী। এ সংযোগ প্রথমে তাদের নিকটবর্তী পরিবারের সঙ্গে এবং তারপর চারপাশের বৃহত্তর সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘটে। যদি সেই সংযোগটি না ঘটে, তবে মস্তিষ্কের যথাযথ বিকাশ নাও হতে পারে।

২) সন্তানকে সম্মান প্রদর্শন করুন। মানুষ হিসেবে সন্তানরা যাতে করে একই বিবেচনার দাবি রাখে যা আমরা বড়দের ক্ষেত্রে সমর্থন করি। এক্ষেত্রে আমাদের শিশুদের সাথে চিন্তাশীল এবং সৌজন্যমূলক আচরণ করা একান্ত জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্চাদের স্নেহশীল, লালন-পালনকারী পিতা-মাতারা একটি বড় হিপ্পোক্যাম্পাস তৈরি করে, যা আরও ভালো স্মৃতিশক্তি, শেখার এবং মানসিক চাপের সময় যথাযথ প্রতিক্রিয়া বাড়ায়। অতএব, যখন আমরা শিশুদের লালন-পালন করি এবং ইতিবাচক হই, তখন আমরা শিশুর মনকে সম্মান করি। আবার তার ব্যক্তিত্বকে সম্মান করি, যখন আমরা তাকে তার নিজস্ব গতিতে অন্বেষণ এবং বিকাশ করার জন্য সুযোগ দেই। 

৩) সন্তানের সাথে যে সকল সক্রিয় পিতা-মাতা রয়েছেন যারা সন্তানের কোন গুরুতর সমস্যা বাড়ার আগেই প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ দেখেই সম্ভাব্য সমস্যাজনিত আচরণ শনাক্ত করতে ও সমাধান করতে সক্ষম হন। সন্তানের সাথে প্যারেন্টিং সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে, সন্তানের সাথে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে ও শিক্ষা দিয়ে জটিল সমস্যাকে শুরুতেই নিমিষেই শেষ করে দিতে পারি। সক্রিয় সন্তান প্রতিপালনের অর্থ হলো পিতামাতা তাদের সন্তানদের আচরণে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সাড়া দেন। যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল পিতামাতা আবেগপ্রবণভাবে কাজ করেন, সাড়া প্রদানকারী পিতামাতা সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তাদের পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে সক্ষম হন।

৪) সন্তানদের সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে। যদি পিতা-মাতা সন্তানের সবকিছুই মেনে নেবেন, তাহলে ইতিবাচক পিতামাতা থাকবেন, বিষয়টি তেমন নয়। পিতা-মাতাই সন্তানের সবকিছুর নেতৃত্ব দেবেন, পথপ্রদর্শক হবেন, কিন্তু একটু ভিন্নভাবে। এতে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে, তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবতে শুরু করবে এবং তাদের জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যার কারণে পিতা-মাতার ওপর তারা ভরসা করতে পারবে, বিশ্বাস স্থাপন করতে শিখবে এবং পিতামাতার সঙ্গে তাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে।


প্রিয় পাঠক, আমরা আজকের এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে ইসলামিক দৃষ্টিতে ও সামাজিকভাবে সন্তানের সহিত পিতা মাতার সম্পর্ক কেমন হবে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা পেলাম। আজকের এই আর্টিকেলটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪