OrdinaryITPostAd

চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রা সম্পর্কে জানুন!

স্পেস জগতের এক ঐতিহাসিক মাইল ফলক চন্দ্রযান-৩। এই প্রথমবার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর পৃষ্ঠদেশের উষ্ণতা বর্ণনা করেছে কোন এক মহাকাশযান। চাঁদের পৃষ্ঠদেশের গভীরতার সঙ্গে তাপমাত্রার কী সম্পর্ক? আজকের এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রা সম্পর্কে আপনাদেরকে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করব। চলুন জেনে নেই, মহাকাশের চন্দ্রগ্রহের চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণে তাপমাত্রার আধিক্য সম্পর্কে।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই প্রথম চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুর মাটির তাপমাত্রা কেমন তার সন্ধান দিয়েছে চন্দ্রযান ৩। গত ২৩ অগস্ট, ২০২৩ তারিখে ভারতীয় গ্রীনেজ টাইম সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলতার সাথে পদার্পণ করেছিল ল্যান্ডার বিক্রম। ল্যান্ডিং করার তিন ঘণ্টা পর ল্যান্ডারের ভিতর থেকে র‍্যাম্প বেয়ে বেরিয়ে আসে রোভার প্রজ্ঞান। চন্দ্রপৃষ্ঠে চাকা গড়ায় রোভারের এবং প্রজ্ঞানের চাকায় বিদ্যমান অশোক স্তম্ভের ছাপ পড়তে থাকে চন্দ্রপৃষ্ঠে। পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যাত্রা শুরুর ৪১ দিনের মাথায় চন্দ্রপৃষ্ঠে পদার্পণ করেছে চন্দ্রযান-৩। চন্দ্রপৃষ্ঠে পদার্পণের চারদিনের মাথায় অর্থাৎ ২৭শে অগস্ট প্রকাশ্যে এসেছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মৃত্তিকা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ ইসরো অর্গানাইজেশন এক পোস্টের মাধ্যমে চন্দ্রযান-৩ এর পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত আপডেট চিত্র প্রকাশ করেছে চন্দ্রযান-৩। চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরু থেকে চন্দ্রযান-৩ এর ল্যান্ডার বিক্রম-এ রয়েছে ChaSTE (Chandra's Surface Thermophysical Experiment) পেলোড যার মাধ্যমেই চলছে সমস্ত পর্যবেক্ষণ কার্যকলাপ। যেটি নির্মাণ করেছে বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারের স্পেস ফিজিক্স ল্যাবরেটরি।

প্রাথমিকভাবে অ্যাপোলো মিশনগুলি ১৯৬০ ও ৭০ দশকে চাঁদের বিষুবরেখা অর্থাৎ মাঝ বরাবর টার্গেট করেছিল। চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরু এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষের তৈরি কোনও কিছু ইতোপূর্বে আগে যায়নি। হিমশীতল, গর্তে নিমজ্জিত মৃত্তিকায় ভরা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এই প্রথম কোন মহাকাশযানের অবতরণ। ক্ষুদ্র প্রজ্ঞান রোভারটি তার মাদারশিপ বিক্রম ল্যান্ডার থেকে একটি র‍্যাম্প দিয়ে নিচে নেমে আসে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চারপাশে অনুসন্ধান শুরু করে। ভারতের চন্দ্রযান-৩ মিশন থেকে ল্যান্ডারটি চাঁদের দক্ষিণ মেরু থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবতরণ করেছে। চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুতে ভারতের এই সফল অবতরণকে মানুষের চাঁদে যাওয়ার তৎপরতার প্রথম ধাপ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে।

চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রা
এক্স এর দ্বারা ইসরোর তরফ হতে যে গ্রাফচিত্র শেয়ার করা হয়েছে, সেখানে লুনার সারফেস মোটকথা চন্দ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বিভিন্ন গভীরতায় কেমন তা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে। এর দ্বারা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মৃত্তিকার তাপমাত্রার পরিমাপ করা সহ চন্দ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা সম্পর্কে সন্ধান পাওয়া যাবে। চন্দ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত আপাততঃ তাপমাত্রার অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। গভীরতার সঙ্গে তাপমাত্রার রয়েছে ব্যাপক আনুপাতিক সম্পর্ক। controlled penetration mechanism- এই পদ্ধতিতেই পরিমাপ করা হয়েছে চন্দ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা। পাশাপাশি মাটির অভ্যন্তরে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে উষ্ণতা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাও প্রকাশ করা হয়েছে ।

চাঁদের তিব্র তাপমাত্রা সম্পর্কে আগেই ধারণা দিয়েছিল নাসা। এর নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বরাবর দিনের বেলায় তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো থাকে, আর রাতের বেলায় সেটা মাইনাস ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামতে পারে। মেরু অঞ্চলে এই তাপমাত্রা আরও কম বলা হয়। যেমন উত্তর মেরুতে একটি গর্তে মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যা সৌরজগতে পরিমাপযোগ্য তাপমাত্রার মধ্যে সর্বনিম্ন। চাঁদের ধুলোমাখা পথে প্রজ্ঞান রোভারটি প্রতি সেকেন্ডে ১ সেন্টিমিটার পার করতে করতে এর মাদারশিপ থেকে বেশ কয়েক মিটার দূরে চলে এসেছে। চলতিপথে প্রজ্ঞান রোভারটি তার সেন্সর দিয়ে চাঁদের মাটি কিছুটা খুঁড়েও দেখেছে। তাতে তাপমাত্রার পার্থক্যের এক অদ্ভুত চিত্র সামনে এসেছে। যেখানে চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত উত্তপ্ত, সেখানে মাত্র ৮০ মিলিমিটার বা ৩ ইঞ্চির মতো নিচে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রিতে নেমেছে, যেটা একেবারে হিমশীতল। মহাকাশযানে থাকা যন্ত্রাংশের রাসায়নিক বিশ্লেষণ বলছে চাঁদের মাটিতে সালফার, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, টাইটানিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম এবং অক্সিজেনের আধিক্য রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ মেরু বরাবর যে মেরুরেখায় পৃথিবী ঘোরে সেটা ২৩.৫ ডিগ্রি কাত হয়ে থাকে, কিন্তু চাঁদের ক্ষেত্রে সেটা ১.৫ ডিগ্রি। এর অর্থ চাঁদের মেরুর বেশ কিছু গর্ত বা গহ্বরে কখনো আলোই পৌঁছায় না। তাইতো এই সকল গর্তকে অনন্ত অন্ধকারের গর্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়।

চন্দ্রপৃষ্ঠের এমন পরিবেশ ও নিম্ন তাপমাত্রা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে বরফ জমা রয়েছে যার অনেকটাই পানি থেকে তৈরি। কোটি কোটি বছর ধরে সঞ্চিত হয়েছে এমন বরফ। হয় সে বরফ মাটির সাথে মিশে আছে, অথবা চন্দ্রপৃষ্ঠে উন্মুক্ত অবস্থাতেই আছে। সে বরফ নভোচারীদের জন্য এক ধরণের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং অদূর ভবিষ্যতে এটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভিত্তিও হতে পারে।

চাঁদের অন্ধকার গহ্বরগুলো বিশেষ কৌতুহল সৃষ্টি করে যেগুলোকে বলা হচ্ছে চিরস্থায়ী ছায়ায় আচ্ছন্ন এলাকা। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে উত্তর মেরুর চাইতে অনেক বেশি গহ্বর রয়েছে। সেটা হয়তো বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডের আঘাতে হতে পারে যেটা দক্ষিণ মেরুকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। সেসব ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরের তাপমাত্রা মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামতে পারে যেটা বরফ খোঁজার আদর্শ জায়গা হতে পারে। জানা যায়, নাসা কর্তৃক ভাইপার নামের একটি রোভার যান আনুমানিক ২০২৪ সালের শেষের দিকে চন্দ্রপৃষ্ঠের গহ্বরে ঢুকে অভিযান চালানোর কথা রয়েছে।

বরফ বা পানির অস্তিত্ব নিয়ে যে এতো আগ্রহ সেটা সত্যিই যদি অনেক বেশি হয় তবে চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপন ও সৌরজগতের আরও দূরে অনুসন্ধানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চাঁদের মাটি থেকে বরফ তুলে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনে ভাঙ্গা গেলে সেটা রকেটের জ্বালানির মূল উপাদান এবং মানুষের বসতির জন্য খাবার পানি ও অক্সিজেনের উৎস হতে পারে। চাঁদের সেসব জায়গায় বছরে ৯০% পর্যন্ত আলোকিত থাকে সেখানে মাটি থেকে অক্সিজেন বা অ্যালুমিনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ভালো সৌরশক্তি পাওয়া সম্ভব।

চন্দ্রপৃষ্ঠের উদ্ভাবনী সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই দক্ষিণ মেরুর প্রতি পক্ষপাতিত্বের পেছনে রয়েছে ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনাও। বর্তমান বিশ্বে এখন পর্যন্ত যত স্পেস এজেন্সি রয়েছে সকলেই দক্ষিণ মেরুর বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে জানতে চায়। কারণ, এখানকার সম্ভাব্য বরফ-পানির মজুত একেবারে বসত করার পরিকল্পনা গ্রহণ না করলেও অদূর ভবিষ্যতে স্পেস স্টেশন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

প্রিয় পাঠক, আমরা আজকের এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রা সম্পর্কে এবং অদূর ভবিষ্যতে চন্দ্রপৃষ্ঠের দক্ষিণ মেরু নিয়ে স্পেস জগতের সম্ভাবনাময় কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেলাম। আজকে আর্টিকেলটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪