দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণ করার যত উপায় জেনে নিন
শীতকালীন অথবা বছরের যে কোন মৌসুমে ঠাণ্ডা জনিত কাশি ছোট-বড় সকলেই কম-বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে, কাশির ধরণ অনুযায়ী এটি কারও ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয় আবার কারও কারও কাশি সাড়তে দীর্ঘদিন সময় লেগে যায়। যার কারণে নিজেকে খুবই অস্থির পরিস্থিতে পড়তে হয়। তাই, এমন সমস্যা থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পেতে এবং দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণ করার উপায় সম্পর্কে ধারণা দিতে আজকের বিস্তারিত আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
বিশেষকরে শীতকাল ঠাণ্ডা জনিত যতপ্রকার সঙ্ক্রমণের প্রভাবান্বিত সময়। কিন্তু, বর্তমানে এটি কেবল শীতকালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথেও কাশিজনিত সমস্যায় অনেককেই ভুগতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে কাশি নিয়ে চলতে হয়। এমন পরিস্থিতি থেকে দ্রুতই নিস্তার পেতে আজকের আর্টিকেলটি।
পেজসুচিপত্রঃবিগত সময়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সমকালে কাশি একটি জনমনে আতঙ্কের নাম ছিল। কিন্তু কাশি যদিও স্বাভাবিক তারপরেও অনেকেই এখনও আছেন যারা কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির নিকট থেকে যতটা মনে হয় দূরে থাকার চেষ্টা করেন। যার কারণে যারা কাশির সমস্যায় পড়েন তাদেরকে চলা ফেরা করতে যেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতে পড়তে হতে দেখা যায়। প্রিয় পাঠক, চলুন জেনে নেই কিভাবে দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণ করার যায়, তার সঠিক উপায়গুলো কি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণ করার যত উপায়
দীর্ঘদিন ধরে আপনার শরীরে যখন কাশি দেখা দিবে সেক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে দৈনন্দিন কিছু টিপস অনুসরণ করার মাধ্যমে এ থেকে নিস্তার পেতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের কাশি সারার ক্ষেত্রে এর ধরণ নির্ণয় করে তারপর সমধান এর দিকে এগুতে হবে।
দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের উপরে দৃষ্টি রাখতে পারেন, যা আপনার কাশি নিবারণে একটি সহজ সমাধান দিতে পারেঃ-
১) কাশি নিবারণে যষ্টি মধু
কাশি নিবারণে যষ্টি মধু বেশ কার্যকরী। বুক ও গলার অভ্যন্তরের জমাট বাঁধা স্লেশা কাশি দূরীকরণে বেশ উপকারী। আপনি পরিমিত পরিমাণে প্রতিদিন গরম পানি বা চা এর সাথে মিশ্রিত করে সকালে অথবা রাতে যষ্টি মধু পান করতে পারেন। বিশেষ করে এই শীতকালে এই অভ্যাসটি নিয়ম মেনে করতে পারলে ঠাণ্ডা জনিত কাশি যেমন দূরীভুত করে অন্যদিকে গলায় প্রশান্তি আনার ক্ষেত্রে ও দীর্ঘদিনের কাশি কমানোর ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।
২) কাশি নিবারণে আদা, মধু ও তুলসী
কাশি নিবারণে আদা হতে পারে কার্যকরী উৎস। বিশেষ করে আদার মধ্যে থাকা জিঞ্জেরল ও শোগাওল নামীয় জৈব যৌগ উপাদান যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। পাশাপাশি আদা আমাদের শরীরে একপ্রকার ঔষধি চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে থাকে। তাছাড়া, আদার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস ইত্যাদি, যা আমাদের শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখার ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকে। আরও উল্লেখ্য যে, হাফানির প্রদাহজনিত কাশি দূর করার ক্ষেত্রেও আদা হতে পারে উপকারি উৎস্য। তাই, প্রতিদিন সকাল অথবা রাতে গরম চায়ের সাথে আদা সংযুক্ত করা উপকারী ডায়েট হিসেবে সহজপন্থা হতে পারে। আবার মধুর সাথে মিশিয়েও আদা খেতে পারলে গলার প্রদাহ কমাতে বেশ কাজে দেয়। এইবার কাশি নিবারণে আদা ও মধুর পাশাপাশি তুলসী গাছের পাতার রস বেশ কার্যকরী বলে গবেষণায় প্রমাণিত। এক্ষেত্রে আপনি চাইলে আদার সাথে তুলসী পাতার রসসহ চা পান করলেও কাশি নিবারণে উপকার পেতে পারেন।
৩) প্রদাহ কাশি নিবারণে অ্যান্টিহিস্টামিন
প্রদাহ জনিত কাশি নিবারণে আদার উপশম বেশ প্রভাবন্বিত করলেও অনেক্ষেত্রে কাশি দীর্ঘায়িত হলে অন্য কোন উপায়ন্তর থাকে না। তাৎক্ষণিক এ অবস্থা থেকে সহজেই মুক্তি পেতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কাশি প্রতিরোধীয় অ্যান্টিহিস্টামিন খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অ্যালার্জিজনিত কাশি নিবারণেও অ্যান্টিহিস্টামিন বেশ কাজ করে থাকে। হাঁপানির প্রদাহ জনিত দীর্ঘস্থায়ী কাশির ক্ষেত্রেও সাধারণত ইনহেলড কর্টিকোস্টেরয়েড, ব্রঙ্কোডাইলেটর ধরনের ঔষধ সাপোর্ট দিতে পারে। এই ঔষধগুলো মুলত কাশির প্রদাহ কমাতে ও শ্বাসনালী ক্লিয়ার করতে বিশেষভাবে কাজ করে থাকে।
৪) ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণেও আপনার কাশি দীর্ঘায়িত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করতে পারেন। তবে, সবসময় এন্টিবায়োটিক এর উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন অনুপাতে গ্রহণ করাই শ্রেয়। বিশেষ করে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ থাকলে ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার আপনার দৈনিক খাদ্য তালিকায় রাখাটা আপনার জন্য যুক্তিযুক্ত হতে পারে। অত্যধিক অ্যান্টিবায়োটিক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে। তাই, ভাইরাস জনিত কাশি দূরীকরণে অল্প পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে ভাল হয়।
৫) কাশি দূরীকরণে স্টিম ইনহেলেশন
কাশি দূরীকরণে স্টিম ইনহেলেশন একটি যুগান্তকারী ব্যবস্থা। এটি দীর্ঘদিনের কাশির দূর করতে সঠিক ও কার্যকরী পন্থা। যাদের কাশির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে শ্লেষ্মা তৈরি হয় তাদের এই পদ্ধতিটি বেশ উপকারে আসতে পারে। গরম পানির সাথে ইউক্যালিপটাস গাছের পাতার ভেষজ উপাদান মিশ্রিত করে গারগেল করলেও বুকে বা গলায় জমে থাকা দীর্ঘমেয়াদি শ্লেষ্মা কাশি প্রতিরোধে বিশেষভাবে কার্যকর। এটি আপনাকে দীর্ঘদিনের কাশি থেকে অর্থাৎ শ্লেষ্মা কাশি আলগা করতে অনেকটাই পরিত্রাণ দিতে পারে।
৬) লবণ ও গরম পানির মাধ্যমে গড়গড়া
লবণ ও গরম পানির মাধ্যমে গড়গড়া করলেও দীর্ঘমেয়াদি কাশির জন্য খুবই উপকারী হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে কাশি নিবারণের জন্য সকল বয়সীদের এই পন্থা অনুযায়ী কাশি দূর করতে দেখা যায়। আপনি চাইলে এটি ঘরে বসেই প্রস্তত করে নিতে পারেন। প্রথমেই এক গ্লাস গরম পানি নিন। তার মধ্যে খানিকটা আধা, লবণ মিশিয়ে দৈনিক ৩-৪ বার নিয়মিতভাবে গলা উঁচু করে গরগরা করলেই কাশি দ্রুতই নিরাময় হয়ে যায়।
৭) কাশি দূর করতে গরম তরল পানি
কাশি দূর করতে গরম তরল পানির কোন বিকল্প নেই। বিশেষ করে এই সময় অতিমাত্রায় ঠাণ্ডার কারণে বুক ও মাথা জাম হয়ে থাকে। কাশির প্রাদুর্ভাব কমাতে প্রয়োজনে ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা, ভিবিন্ন প্রকারের স্যুপ, কুসুম কুসুম গরম পানি পান করলে দীর্ঘমেয়াদি কাশির জন্য উপকারী উপশম হতে পারে। এই সময় গরম পানি খেলে আপনি একটি উপকার পেতে পারেন তা হল খুব দ্রুতই বুকে জমাট বাঁধা কাশি দূর হয়।
৮) ভেষজ উপাদান দিয়ে চা পান
দীর্ঘমেয়াদি কাশি দূর করতে গরম তরল পানির খাওয়ার পাশাপাশি ভেষজ উপাদান দিয়ে প্রস্তুতকৃত চা আপনার জন্য উপকারীর মাধ্যম হতে পারে। একদম ঘরোয়া পদ্ধতিতে আপনি এই চা প্রস্তুত করে খেতে পারেন। কিভাবে তৈরি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। একদ্ম চায়ের সাথে আদা, তুলসী, লং, দারচিনি, লেবু দিয়ে প্রস্তুতকৃত চা পান করুন।
৯) হলুদ দিয়ে মিশানো দুধ খাওয়া
দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণে হলুদ দিয়ে মেশানো দুধ আপনার জন্য হতে পারে উপাকারি একটি মাধ্যম। হলুদ বিশেষ করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে উন্নত করতে সহায়তা করে। এক গ্লাস কুসুম কুসুম গরম দুধে খানিকটা হলুদ মিশেয়ে এই সময় গরম দুধ পান করতে পারেন। গরম দুধে হলুদ মিশিয়ে খেলে উপকারের মধ্যে গলার কাশি ও দীর্ঘদিন ধরে বুকে জমাট বাঁধা কফ নিরাময় করে।
১০) লেবু ও মধু:
আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী কাশি নিবারণ করতে চান তবে লেবু ও মধু হতে পারে উপকারী মাধ্যম। বিশেষকরে, হাল্কা কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খেলে স্লেমা জাতীয় কাশির উপশমে আরাম হয়।
ক্রনিক কাশি কি?
ক্রনিক কাশি হল এমন একপ্রকার কাশি যা দীর্ঘস্থায়ী কাশি হিসেবে পরিচিত। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটির স্থায়িত্বের পরিমাপ হয় সাধারণত আট সপ্তাহ বা তার বেশী, আর শিশুদের ক্ষেত্রে চার সপ্তাহ ব্যাপী হয়ে থাকে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাশি হিসেবে পরিচিত যা আমাদের দেহের অন্তর্নিহিত সমস্যাকে চিহ্নিত করে। এইরূপ দীর্ঘস্থায়ী কাশির জন্য চিকিৎসার বিকল্প নেই। ক্রনিক কাশির কারণে বিশেষকরে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির জীবনধারার উপরে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কাশির ক্ষেত্রে সতর্কতা
কাশি এমন একটি প্রদাহ যা আমাদের শরীরকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে ব্যাহত করে। তা যদি কাশিটি ক্রমাগত দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকে তাহলে এটি আমাদের শারীরিকভাবে ও সামাজিকভাবে নানান সমস্যার রূপ নেয়। একটি বিরক্তিকর কাশি যা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে তা কেবল বিরক্তিকর নয়- এটি একজনের জীবনযাত্রার মানকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আপনার কাশি যদি স্বাভাবিকের চাইতে বেশী দিন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে কাশি নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ একান্ত বাঞ্ছনিয়।
শেষ কথা
শীতকাল অথবা গরমে দীর্ঘস্থায়ী কাশি এখন একটি গুরতর সমস্যা। কাশি হলেই আমরা এখন অনেকেই প্রাথমিকভাবে হতাশ হতে দেখা যায়। একটি সময় করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবের সময়কালীন কাশি মানেই জনমনে আতঙ্কের নাম। তবে, সব কাশিই যে করোনা তা কিন্তু নয়। অর্থাৎ আপনি যদি দীর্ঘদিনের কাশি নিবারণ করার উপায় খুঁজছেন তাহলে আজকের আর্টিকেলটি আপনার জন্য। আজকের আর্টিকেলটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে থেকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলা আর্টিকেল পড়ে সাস্থ্য সম্পর্কিত টিপস জানতে আমাদের ওয়েবসাইটটি বেশী বেশী ফলো করার প্রত্যাশা রইল। ধন্যবাদ।



আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।
comment url