সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস সিস্টেম, কিভাবে চালককে সহায়তা করে

এখন প্রায়শই খবরের পেজ খুললেই চোখে পড়ে দূর্ঘটনায় অনাকাঙ্খিত ও অপমৃত্যু। সামাজিক সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও কোন ভাবেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, সড়কে দূর্ঘটনা যদি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে রোধে করা যেত তাহলে কতইনা ভালো হতো তাইনা। সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস (ADAS) প্রযুক্তি কিভাবে একজন যান চালককে সহায়তা করে সে সম্পর্কে জানতে এবং জানাতে আজকের আর্টিকেলটি আপনার জন্য। 
পেজ সূচিপত্রঃসাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা একটি আতঙ্কের নাম। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষকরে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অধিক জনসংখ্যা, ঘনবসতি জনজীবন, অধিক মাত্রায় পাবলিক ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার, সড়কে গাড়ী চালানোর ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ
গুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার হারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে একটু বেশী। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই ঘটে থাকে মানুষের সামান্য অসাবধানতার কারণে। দুর্ঘটনার প্রবণতা দেখা দিলেও আমরা আবেগের বশবর্তী হয়েও অনেকসময় যানবাহন চালাতে থাকি, এতে করেও ক্রমশই দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে। অনেকই  নাড়ীর টানে পরিবারের সাথে একটু আনন্দের খুঁজে ভ্রমন করেন, সেই ভ্রমনও হয়ে যায় অনেকসময় জীবনের শেষ ভ্রমণ। 
বর্তমান সময়ে আমরা প্রায় সকলেই কম-বেশী প্রযুক্তি নির্ভর। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে আমরা ইচ্ছা করলেই নিজেদের জীবনকে পরিবর্তন করতে পাড়ি। টিভিতে বা খবরের কাগজে প্রায়শই দেখি অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অথবা আহত হয়েছে। তাই, সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে এমন কিছু প্রযুক্তি নির্ভর সিস্টেম রয়েছে যা আমাদের সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারবে। চলুন জেনে নেই, সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস সিস্টেম, কিভাবে চালককে সহায়তা করে।

সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম

অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স (ADAS) হলো এমন একধরণের প্রযুক্তি যা একজন অচেতন চালককে ড্রাইভিং এর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে এবং মোটরযানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেতে সহায়তা করে। এই সিস্টেমটি মূলত এআই ও সেন্সর ভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তি যা একজন মোটরযান চালককে দূর্ঘটনা রোধে সহায়তা করে থাকে। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান খুঁজলে দেখা যায়, রাত্রিকালে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা হয়ে থাকে চালকের অসতর্কতার কারণে। মোটরযানে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম আপনাকে দিতে পারে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত জীবন।

কি কারণে যানবাহনে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম চালু করবেন

বর্তমান বিশ্ব এখন এআই (AI) অর্থাৎ, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির নির্ভরতায় পরিণত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। যার ফলে একদিকে যেমন কাজের ধরণে পরিবর্তন এসেছে, পাশাপাশি এর ব্যবহারেও এসেছে নতুনত্ব। তাই, যানবাহনে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম তারই অংশবিশেষ। কি কারণে আপনি যানবাহনে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম চালু করবেন তারই একটি ধারণা নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরা হ'ল-

ক) সাবধানতায় এডিএএস (ADAS) সিস্টেম

রাত্রিতে দীর্ঘক্ষণ গাড়ী চালালে অনেকসময় চালকের ক্লান্তি আসে। চোখে তৈরি হয় ঘুম। আলস্য ঘুমের কারণে চোখের দৃষ্টিতে পলক পড়ে। সেক্ষেত্রে সাবধানতার জন্য এডিএএস প্রযুক্তিগত সিস্টেম আপনার ড্রাইভিং করা-কে আরও করবে নিরাপদ।

খ) পর্যবেক্ষণে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম

যানবাহনে এডিএএস সিস্টেম সংযুক্ত করা হলে এর মধ্যে থাকা সেন্সর ও ক্যামেরা দ্বারা আপনার গাড়ির চারদিকের অবস্থা আপনি যেমন পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, পাশাপাশি গাড়ির পাশে দিয়ে যাওয়া চলন্ত গাড়ী, মানুষ ও রাস্তার সিগন্যাল সম্পর্কিত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে সহজ হবে।

গ) আগাম সতর্কবার্তায় এডিএএস এর এআই (AI) প্রযুক্তি

গাড়ী চালানোর ক্ষেত্রে দৃষ্টি এড়ানো, অসতর্কতা, শারীরিক ক্লান্তি, অনিয়ন্ত্রিত গতি ও তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সড়কে ঘটছে প্রাণহানি, বাড়ছে রোড এক্সিডেন্ট। এমন পরিস্থিতি থেকে দ্রুতই উত্তরণের জন্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন মানুষ তার অনেক কঠিন কাজও সহজ করে নিয়েছে। বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ এআই নির্ভরতা। বিশ্বের অনেক নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিজ্ঞানী ইলনমাস্ক-এর টেসলার তৈরি করা এআই প্রযুক্তির চালকবিহিন গাড়ী এখনও পর্যন্ত সেরাদের তালিকায় রেকর্ড গড়েছে। 
এছাড়া, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ এআইভিত্তিক চালকবিহীন গাড়ি ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন যাবৎ এই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। তাদের লক্ষ্য একটাই যে, প্রযুক্তির ব্যবহারের দ্বারা সড়ককে নিরাপদ রাখা। এক্ষেত্রে, এডিএএস (ADAS) এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহকৃত তথ্যগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করতঃ চালককে আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করে। ফলে গাড়ী চালোনার ক্ষেত্রে চালক নিজেকে নিরাপদ বোধ করতে পারেন। এটি এডিএএস সিস্টেমের বিশেষত্ব। 

ঘ) যাত্রাপথে তাৎক্ষণিক ব্রেক করতে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম

এডিএএস সিস্টেমের আরও একটি বিশেষত্ব হল, যাত্রাপথে কখনও চালক যদি রানিং গাড়ী ব্রেক করতে হটাৎ ভুলে যান তখন এডিএএস তার সিস্টেম থেকে তাৎক্ষণিক ব্রেক করে এবং স্টিয়ারিং ঘুড়িয়ে দুর্ঘটনা প্রতিহত করে থাকে। এডিএএস সিস্টেম যানবাহনে চালু করলে এর আরও একটি বিশেষত্ব হল, এটি তার সেন্সর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাড়ির আশেপাশের কোন বস্তুর সাথে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ইমার্জেন্সি ব্রেকিং এর মাধ্যমে গাড়ি থামিয়ে দেয়।
আরও পড়ুনঃ বজ্রপাতের কারণ ও বাঁচার উপায় জানুন

ঙ) এডিএএস এর লেন কিপিং অ্যাসিস্ট (LKA)

এডিএএস সিস্টেমের আরও একটি ফিচার হল এর লেন কিপিং অ্যাসিস্ট (LKA) প্রযুক্তি। আমরা দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেকসময় উচ্চ গতিতে গাড়ি চালালে আমাদের চলতি গাড়ী হটাৎ লেন থেকে সড়ে যেতে পারে। যার ফলে আপনার চলতি গাড়িটি হটাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আশঙ্খা দেখা দিতে পারে। তাই, আপনার দামি গাড়িটিতে এডিএএস এর লেন কিপিং অ্যাসিস্ট সিস্টেমটি চালু থাকলে হটাৎ যদি গাড়ী নির্দিষ্ট ট্র্যাক থেকে সড়ে যেতে থাকে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গাড়িকে সঠিক লেনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।

চ) এডিএএস এর অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল (ACC)

এডিএএস সিস্টেমের অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল (ACC) আরও একটি অত্যাধ্যুনিক প্রযুক্তি। সামনে থাকা গাড়ির মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল ব্যবহারের মাধ্যমে গাড়ির উচ্চ গতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমিয়ে গাড়িকে একটি নিরাপদ দুরত্বে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
আরও পড়ুনঃ এসি বিস্ফোরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরী!!! 

ছ) এডিএএস এর ব্লাইন্ড স্পট মনিটরিং (BSM)

এডিএএস সিস্টেমের আরও একটি বিশেষ দিক হল, এটি ব্লাইন্ড স্পট মনিটরিং (BSM) দ্বারা চালকের চোখের আড়ালে থাকা যদি কোনো বস্তু অথবা গাড়ি থাকে তা খুব সহজেই শনাক্ত করে দিতে পারে এবং তাৎক্ষণিক সংকেত দিতে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ী চালানোর সময়ে গাড়ী টারনিনং করতে বেগ পোহাতে হয় না যা আগাম সতর্কতার জন্য কাজ করে।  

জ) ড্রাইভার মনিটরিং: 

চালক ঘুমিয়ে পড়ছেন কি না বা অমনোযোগী কি না, তা চোখে ও মুখের আচরণ দেখে শনাক্ত করে অ্যালার্ম বাজায়। বাংলাদেশে সরাসরি স্বচালিত বা চালকবিহীন গাড়ি চালানো চ্যালেঞ্জিং হলেও, এডিএস (ADAS) প্রযুক্তি সংযোজিত গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে মহাসড়ক ও শহরের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়া সরকার মহাসড়কগুলোতে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বা আইটিএস (ITS) প্রযুক্তিরও সম্প্রসারণ করছে, যা দূর থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থা ও দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে

শেষ কথা

সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস (ADAS) সিস্টেম নিয়ে যেভাবনাগুলো জন্ম দিয়েছে তার সবগুলোই আমাদের প্রযুক্তি, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যত কল্পনাতে অঙ্গাআঙ্গিভাবে মিশে আছে। দিন দিন প্রযুক্তিখাতে যে আমূল পরিবর্তন আসছে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে শিখতে হবে এবং জানতে হবে প্রযুক্তি সম্পর্কে। নতুন নতুন উদ্ভাবনীয় বিষয় সম্পর্কে এখন জ্ঞান রাখা জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির বিকাশ অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন আমাদের জীবনযাত্রা সহজ হবে এবং বিশ্ব আরও সংযুক্ত হবে। আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা আপনাকে সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এডিএএস সিস্টেম, কিভাবে চালককে সহায়তা করে সে সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা দিতে পেড়েছি। আজকের আর্টিকেলটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আজকের মতো বিদায় নিলাম।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url