রাত ভোর ঘুমানোর পরও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হলে কি করবেন
দিন শেষে আসে রাত। এটিই সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত বিধান। দিন যেমন কখনও রাতকে অতিক্রম করতে পারে না, তেমনি রাত দিনকে অতিক্রম করতে পারে না। সারাটি দিন কাজ শেষে ক্লান্ত মনে রাতে আমাদের ঘুমের জন্য বিছানায় আসতে হয়। তাই, রাত ভোর ঘুমানোর পরও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হলে যা যা করবেন সে সম্পর্কে ধারণা দিতে আজকের বিস্তারিত আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃমহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা যেমন রাতের একটি নির্দিষ্ট অংশ আমাদের ঘুমের জন্য রেখেছেন, সেহেতু রাতের ঘুম একজন সুস্থ্য সবল মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু অনেকসময় আমরা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও দেখা যায় শারীরিক ক্লান্তি দূর হয় না। কাজে কর্মে মনোনিবেশ করতে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আসুন বিস্তারিত জেনে নেই রাত ভোর ঘুমানোর পরেও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হলে কি করবেন।
রাত ভোর ঘুমানোর পরেও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হলে কি করবেন
দিনে কাজ আর রাতের বেলায় ঘুম এটি পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম। এই নিয়মের বাহিরে আপনি আমি কেহই নয়। আমরা কেন ঘুমাই বা ঘুম আমাদের কেনইবা প্রয়োজন এটি আসল কথা। পরিমিত ঘুম আমাদের শরীর ও মনকে নতুন উদ্যমে কাজ করার উৎসাহ জোগায়। মনকে করে প্রশান্ত।
অনেকেই জানতে চান, দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুমের পরে ঘুম থেকে উঠার পড়ে কেন আমাদের শরীর ক্লান্ত ও দুর্বল অনুভূত হয়। ঘুমের পরে শরীরে দেখা দেয় ক্লান্তির ছাপ, মাথা থাকে ভার, মেজাজ থাকে খিটখিটে, মুখের লাবন্যতা হারায়, ঘুমের অপ্রতুলতায় অকালে চুল পড়তে থাকে, মাথা ও ঘাড়ে অসহনীয় ব্যাথা। পরিমিত বিশ্রাম নেওয়া হলেও যদি কাজ করার শক্তি না পান সেক্ষেত্রে আপনি নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো ঘুমের ক্লান্তি দূর করতে সহজ সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।
১) ঘুমের জন্য টাইম-টেবিলঃ
প্রতি রাতেই ঘুমোতে যাচ্ছেন কিন্তু পর্যাপ্ত নিদ্রাযাপণ করার পরেও কোন প্রকার সমাধান পাচ্ছেন না। পরিমিত ঘুমালেও ঘুমের ঘাটতি রয়ে গেছে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। তাহলে করণীয় হিসেবে ঘুমের জন্য টাইম-টেবিল নির্ধারণ করে দেখতে পারেন। এইরূপ পরিস্থিতে দিনের কোন অংশে অথবা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গেলেও Sound Sleep ঘুম আপনার শরীরকে প্রাণবন্ত করতে সক্ষম হবে। প্রয়োজনে আপনার ফোনে এলারাম দিয়ে ঘুমের সময় নির্ধারণ করে নিতে পারেন।
২) সুস্থ দেহের জন্য ৭/৮ ঘণ্টা ঘুমঃ
আপনার দেহের মুল চালিকা শক্তি হিসেবে ঘুমকে প্রধানত অন্তরায় হিসেবে বেঁছে নিতে পারেন। দৈনিক ৭/৮ ঘণ্টা ঘুম সুস্থতার প্রথম আদর্শ হতে পারে। এক্ষেত্রে, আপনার অবশ্যই উচিৎ হবে যত দ্রুত সম্ভব সকল কাজ শেষ করে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ প্রকৃত ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় বিবেচনা করতঃ ঘুমিয়ে পড়াই শ্রেয়।
৩) ঘুমের জন্য অনুকূল পরিবেশঃ
রাত্রিতে যেনতেন ঘুমও আপনার প্রকৃত ঘুমের উপরে প্রভাব পড়তে পারে। অনুকূল পরিবেশ বলতে এখানে মূলত সয়নের স্থানের পরিবেশকে ঠিক রাখাকে বুঝাবে। ভালো বিছানার চাদর অথাবা পুরাতন হলেও তা ভালোভাবে পরিষ্কার করে সয়নে বিছানো। যার ফলে দেখবেন, আপনার মানুষিক বিকাশ লাভ হবে। এইভাবে ঘুমের স্থানে অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে আপনার নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম সাধিত হবে।
৪) ঘুমের স্থানে হালকা প্রদীপ জালিয়ে ঘুমানোঃ
রাতে নিদ্রাকালে অনেক সময় ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু আপনার ঘুম প্রশমিত হচ্ছে না। তাই, ঘুমের মৌলিক চাহিদা পূরণে আপনাকে সয়নের ঘরে একেবারে অন্ধকার না করে হালকা মিটি মিটি আলো দিয়ে ঘুমাতে গেলেও আপনার আশানুরূপ ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে সহায়তা করবে। ধরুন, আপনি নদির মাঝখানে নঙ্গর তুলে শুয়ে আছেন, অনেক দূর থেকে একটি মিটিমিটি আলো আর চারিদিকে অন্ধকার কি দারুন অনুভূতি তাইনা। তেমনি অনুভূতি আপনার সয়নের ঘরে হালকা মিটিমিটি আলো আর চারিদিকে অন্ধকার ভেবে ঘুমাতে যাচ্ছেন। এইরূপ ঘুম আপনার ঘুমের চাহিদা পুরুনে সক্ষম হতে সহায়ক হতে পারে।
৫) ঘুমের জন্য শরীরে কমল বা আরামদায়ক পোশাক পরিধানঃ
পুরো রাত্রিতে নিদ্রা যাপনের বিষয়ে আসলে কোন প্রকার আপোষ করা যায় না। আপনি যখন ঘুমাতে যান তখন সারাদিনের কাজকর্মে থাকার পর ঘর্মাক্ত পোশাকেই থেকে যান। এই কাজটি আপনি প্রায় প্রতিদিনই করে থাকেন। ঘুমের সময় শরীরে কমল বা আরামদায়ক পোশাক পরিধান না করার ফলে অনেকসময় দেখা যায় পরিমিত ঘুমের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, ঘুম থেকে উঠার পরে অসুস্থ বোধ করেন। তাই, আপনার ঘুমোতে যাওয়ার আগে কমল পোশাক পরিধান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিৎ।
ঘুমের পরে ক্লান্তি আসার বিস্ময়কর কারণ
আমাদের অনেকেরই ধারণা রাত ভোর ঘুমানোর পরে নিমিষেই ক্লান্তি দূর হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরেও এমন কিছু কারণ রয়েছে যেগুলো শরীরে দেখা দিলে ঘুমের পরেও আপনার ক্লান্তি দূর হতে সময় লেগে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে শরীর তার ঘুমের জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করতে সফল হয়েছে। কিন্তু না এটি প্রতিক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় না। চলুন জেনে নেই, ঘুমের পরে ক্লান্তি আসার বিস্ময়কর কারণগুলো কি-
ক. অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েডের কারণ
বর্তমান সময়ে অনেক জটিল রোগের মধ্যে থাইরয়েড একটি। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হতে বেশী দেখা যায়। মূলত ঘাড়ের মধ্যে থাকা একটি ছোট আকৃতির অঙ্গ যা আমাদের শরীরবৃত্তীয় শক্তি ব্যবহার করার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যখন ঘারের এই অঙ্গটি ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হাঁড়াতে বসে তখন শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াতে ধীরগতি চলে আসে। এমনি ধীরগতি আমাদের শরীরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে প্রভাবান্নিত করে ও শরীরে ক্লান্তিভাব চলে আসে। মার্কিন জাতীয় ডায়াবেটিস, ডাইজেস্টিভ এন্ড কিডনি ডিজিজেস অনুযায়ী, হাইপোথাইরয়েডিজম শরীরের প্রক্রিয়াগুলোকে ধীর গতির দিকে ধাবিত করে এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
খ. ভিটামিন ও মিনারেলসের অভাব
ভিটামিন হোল শরীরের প্রধানত জৈব পুষ্টি উপাদান যা আমাদের শরীরকে বিভিন্নভাবে শক্তি সঞ্চয় করে দেহের মৌলিক গঠনে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। আর মিনারেলস বা খনিজ হোল প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত পুষ্টি উপাদান যা মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, দাঁত ও হাড় গঠনে এমনকি শরীরের বিপাকীয় কার্যাবলীগুলো সচল রাখতে কাজ করে। ভিটামিনের মতো মিনারেলস জৈব না হওয়া সত্ত্বেও এটি মাটি অথবা পানি থেকে অথবা উদ্ভিদ ও প্রাণীর খাদ্য প্রণালী থেকে আমাদের শরীরে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক ইত্যাদি প্রধান মিনারেল হিসেবে অনুপ্রবেশ করে। অর্থাৎ শরীরকে ভিতর থেকে শক্তি উৎপাদনে ভিটামিন ও মিনারেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। যখন শরীরে এই দুইটি পুষ্টি উপাদানের অভাব দেখা দেয় তখন শরীরের নানান সমস্যা দেখা দিতে থাকে। বিশেষকরে শরীরে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন-ডি এবং আয়রনের মাত্রা কমে যেতে থাকলে শরীরে ক্লান্তি ভাব দেখা দেয় ও নিস্তেজ হতে থাকে। আবার শরীরে উপরোক্ত উপাদানগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকার ফলেও টিস্যুতে অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা সহ ক্লান্তি এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ উপনয়ন শব্দের অর্থ কি - উপনয়নের বয়স
গ. স্লিপ অ্যাপনিয়া
মানবদেহে স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি ব্যাধি যা আমাদের ঘুমের সময় বারংবার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার পরে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে পুনরায় আবার শুরু হয়। এই বিরতিগুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী হতে দেখা যায়। যার কারণে নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমের চাহিদা পূরণ করতে শরীর ব্যর্থ হয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর প্রবণতা দেখা গেলেও মধ্য বয়সী অনেককেই ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা অর্থাৎ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হতে অনেকেই দেখা যায়।
ঘ. অতিরিক্ত মানুষিক চাপ ও উত্তেজনা
জীবনের চলার পথে মানুষের মন একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে শরীরে যখন কর্টিসল হরমোন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চতর মাত্রায় অবস্থান করে, যার ফলে মানুষের মস্তিষ্ক ঘুমের মধ্যেও সজাগ থাকে। এই সময় শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারলেও মন উদ্বেগ ও উত্তেজনা প্রক্রিয়া চালাতে থাকে। যার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হালকা ও নিরবিছিন্ন ঘুম হতে বাঁধা সৃষ্টি করে।
শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে কি করবেন?
বাহ্যিক দৃষ্টিতে শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে আমরা কত কিছুই করে থাকি। কিন্তু ঘুমের পরে যদি তাৎক্ষনিক শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে চান তাহলে কিছু প্রাকৃতিক নিয়মাবলী মেনে চললেই কিছুটা সমাধান আসতে পারে। এক্ষেত্রে, খালি পেটে এক গ্লাস পানি করলেই আপনাকে দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে। অনেকসময় দেখা যায়, পানিশূন্যতার কারণে শরীরে ক্লান্তি আসে এবং শরীর মেজ মেজ করতে থাকে এবং আপনি ক্লান্ত অনুভব করে থাকেন। এক্ষেত্রে, তড়িৎ ফল পেতে এক গ্লাস পানিই যথেষ্ট হতে পারে।
শেষ কথা
একজন সুস্থ সবল মানুষকে গণনা করলে ঘুমকে প্রাধান্য দিতে হয় সর্ব প্রথমেই। যাদের রাত ভোর ঘুমানোর পরও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হয় তারা মনে হয় জীবনের আনন্দটুকু হাঁড়িয়ে ফেলেছেন, কর্মে স্পৃহা হাঁড়াতে বসেছেন, দৈহিক শক্তি কমতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজেকে উত্তরণ করবেন আজকের আর্টিকেলটি হতে পারে আপনার জন্য সময়োপযোগী। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং রাত ভোর ঘুমানোর পরও শারীরিক ক্লান্তি দূর না হলে কি করবেন সে সম্পর্কে বিশদ জানতে পেরেছেন। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে এবং এতক্ষণ আমাদের সাথে সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আজকের মতো বিদায় নিলাম।

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।
comment url