দৈনিক কতটুকু ভোজ্য তেল খেলে সুস্থ থাকা যায়
বাঙালির রান্নার প্রধান উপকরণ হল ভোজ্য তেল। বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনায় ভোজ্য তেল বিক্রিতে ছয়লাভ। অতিমাত্রায় ভোজ্য তেল খেলে যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, আবার রয়েছে মৃত্যু ঝুকিও। তাই, দৈনিক কতটুকু ভোজ্য তেল খেলে সুস্থ্য থাকা যায় সে সম্পর্কে ধারণা দিতে আজকের বিস্তারিত আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃএশিয়াভিত্তিক দেশগুলোতে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, রান্নার ক্ষেত্রে এখানকার রন্ধন শিল্পিরা ভোজ্য তেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশী করে থাকেন। বিশেষ করে ভোজ্য তেল বলতে সয়াবিন তেলের ব্যবহার সবচাইতে বেশী হয়ে থাকে। অতিমাত্রায় ভোজ্য তেল সেবনের ফলে শরীরে জমতে থাকে নানান মরনব্যাধি রোগ। তাই, এ থেকে নিস্তার পেতে দৈনিক কতটুকু ভোজ্য তেল খেলে সুস্থ থাকা যায় তার সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা পেতে চলুন জেনে নেই।
দৈনিক কতটুকু ভোজ্য তেল খেলে সুস্থ থাকা যায়
পরিমিত ভোজ্য তেল খাওয়াই সুস্থ থাকার জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে থাকে। বাঙালির রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে তেলই হল প্রধান উপকরণ। বিশেষকরে বাঙ্গালির যে কোন খাবার রান্নার পূর্বেই ভাজার প্রয়োজন দেখা দেয় যেমন-ফ্রাই করতে, রান্নার আগে মাছ ও মাংস ভাজতে ইত্যাদি। রান্নার স্বাদ বৃদ্ধিতে মসলার পাশাপাশি তেলের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তাই, তেল ব্যতীত রান্নার কথা চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু অতিরিক্ত তেল খাওয়া সাস্থের জন্য হানীকর। আপনি যদি পরিমিত তেল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে না পারেন তাহলে অল্প বয়সে হতে পারে হার্টের রোগ, বাড়তে পারে কোলেস্টরেল এবং হতে পারে ফ্যাটি লিভার। শরীরে দেখা দিতে পারে অতিরিক্ত মেদ ও স্থ্যুলতা। বিধায়, আপনার সুস্থতার জন্য দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অবশ্যই তেলের পরিমাণটি ঠিক করা বিশেষভাবে জরুরি।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিস্কের যেকোন ব্যক্তির জন্য প্রাত্যহিক ভোজ্য তেল গ্রহণের পরিমাণ হতে পারে ৩/৪ টেবিল চামচ অর্থাৎ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ মিলিঃ যা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, শরীরে ক্যালরি গ্রহণের ক্ষেত্রে মোট ক্যালোরির শতকরা ৩০ ভাগের বেশি যেন চর্বি না থাকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সুতরাং ২০০০ ক্যালোরির ডায়েটের ক্ষেত্রে দৈনিক ২৫/৩৫ মিলিঃ তেল ও চর্বি গ্রহণ স্বাস্থ্যসম্মত। যার মাসিক হিসেবে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে আনুমানিক ৫০০/৬০০ মিলিঃ। তবে, সুস্থ্য থাকার জন্য একজন স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দৈনিক ২০ গ্রামের বেশি তেল গ্রহণ না করাই শ্রেয়। বিশেষকরে যিনারা কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত তেল গ্রহণ করে থাকেন তাদের অল্প বয়সেই দেখা দিতে পারে হার্টের রোগ, শরীরে জমতে পারে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ।
অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণে শরীরে কি কি ক্ষতি হয়
অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণের অভ্যাস আমাদের সব বয়েসেই একটি লক্ষণীয় দিক। আপনি অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনের অজান্তে এই কাজটি করে থাকেন। বিশেষ বিশেষ কোন দিনকে উপলক্ষ করে আমরা বাড়িতে নানান সু-স্বাদু খাবার রান্নার আয়োজন করে থাকি। এই সময় অতিরিক্ত ভোজ্য তেলকে খাবারের স্বাদ দিগুন করতে প্রয়োগ করে থাকি। যার ফলে আমাদের শরীরে বাসা বাদতেছে জটিল থেকে জটিলতর রোগ। রান্নার স্বাদ বৃদ্ধি করতে রোজ মাত্রাত্রিক্ত তেল খাওয়ার কারণে শরীরে দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। নিম্নে অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণে শরীরে কি কি ক্ষতি হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হল-
ক) ভোজ্য তেলে লিভারের ক্ষতি
বর্তমান চিকিৎসা জগতে লিভার সমস্যা একটি জটিল সমস্যা। আপনার শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে লিভার যা নানাবিধ কারণে আক্রান্ত হতে পারে। অতিমাত্রায় ভোজ্য তেল গ্রহণের কারণেও আপনার লিভার ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়তই রান্না করা অত্যধিক তৈলাক্ত খাবার বেশি খেতে থাকলে একপর্যায়ে লিভারে চর্বির আস্তর জমাট বাঁধতে থাকে। যার ফলে, ফ্যাটি লিভার জনিত রোগের আবির্ভাব হয়।
খ) অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণে শরীরিক ক্লান্তি
চিকিৎসকের মতে, রান্না করা খাবারে অতিরিক্ত তেল খাওয়ার ফলেও দেখা দিতে পারে শারীরিক ক্লান্তি। এক্ষেত্রে উচ্চ আমিষ জাতীয় খাবার যেমন তেলে ডোবা মাংস, তেলে ডোবা ভাজাপরা খেলেও আপনার শরীরে ক্লান্তিভাব আসতে পারে। এর কারণে দেখা দিতে পারে হতাশা, কাজ করার প্রতি অমনোযোগিতা, বাড়তে পারে অলসতার মতো নানাবিদ সমস্যা। তাই, শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে আমাদেরকে অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণ করা থেকে সব সময় বিরত থাকতে হবে।
গ) অতিরিক্ত তেলে বাড়তে পারে ওজন
সুস্থ্য থাকতে দেহের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনি কতইনা কসরত করছেন, প্রয়োজনে ডায়েট কন্ট্রোল করছেন, শারীরিক পরিশ্রম করছেন কিন্তু ওজন কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রনেই আসছেনা। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন্না। জেনে ও না বুঝে রান্না করা খাবারে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত তেলে খাচ্ছেন। শরীরে জমতে থাকছে মাত্রাতিরিক্ত ক্যালোরি। এই মাত্রাতিরিক্ত ক্যালোরিই আপনার শরীরের ওজন বাড়ার ক্ষেত্রে দায়ী। এইভাবে ওজন বাড়তে থাকলে শেষ পর্যন্ত শরীরে দেখা দিতে পারে স্থূলতার মতো ব্যাধি।
ঘ) অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণে হৃদরোগের ঝুঁকি
অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণেও ছোট-বড় সব বয়সীদের হৃদরোগের ঝুঁকিতে পড়তে হয়। তৈলাক্ত খাবার প্রয়োজন অনুপাতের চাইতে বেশী খেলে, ট্রান্স ফ্যাট অথবা স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার বেশী খেলে এক পর্যায়ে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পেতে থাকে। একসময় এটিই হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঙ) অতিরিক্ত ভোজ্য তেল গ্রহণে ডায়াবেটিস রোগের আবির্ভাব
অতিরিক্ত ভোজ্য তেল সেবনের কারণেও আপনার শরীরে দেখা দিতে ডায়াবেটিস রোগের মতো মরণব্যাধি রোগ। রান্নায় মত্রাত্রিক্ত তেল খওয়ার ফলে শরীরে ইনস্যুলিনের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে এবং একটি সময় শরীরে ডায়াবেটিস হওয়ার আসঙ্খা দেখা দেয়।
চ) অতিরিক্ত তেল গ্রহণে হজমজনিত সমস্যা
যিনারা হজম জনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন তাদের অবশ্যই অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিৎ। অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার কিংবা রান্নার স্বাদ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনের চাইতে বেশী অতিরিক্ত ভোজ্য তেল দীর্ঘদিন খেতে থাকলে স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। ফলে শরীরে দেখা গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটির মত জটিল জটিল সমস্যা।
কিছু স্বাস্থ্যকর তেলের উপকারিতা
১। অলিভ অয়েলঃ
সুপ্রাচীনকাল থেকে অলিভ অয়েলের ব্যবহার হয়ে আসছে। অলিভ অয়েল মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (MUFA) যা আমাদের হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল দূর করতে ও ইনসুলিন এর সংবেদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
২। সরিষার তেল
স্বাস্থ্যকর তেলের মধ্যে সরিষার তেল বেশ জনপ্রিয়। এটিকে মশ্চারাইড তেল হিসেবে আমরা চিনে থাকি। অনেকেই রান্নার ক্ষেত্রে সরিষার তেলকে ব্যবহার করে থাকে। সরিষার তেলে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যা আমাদের শরীর গঠনে খুবই কার্যকরী।
৩। সয়াবিন তেল
স্বাস্থ্যকর তেলের মধ্যে ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ সয়াবিন তেলও অন্যতম। সয়াবিন তেল বেশ সহজলভ্য হলেও এর অতিমাত্রায় ব্যবহার থেকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ সয়াবিন তেলে রয়েছে ক্ষতিকারক ফ্যাটি চর্বি যা আমাদের শরীরকে ফ্যাটি লিভার ঝুঁকিতে নিমজ্জিত করে।
ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমানোর উপায়
আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশি করে শাকসবজি ও ফল রাখুন। এরপর ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন। একেবারেই ভাজাপোড়া খাবেন না। আর রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা পরিহার করুন। রান্নায় তেলের পরিমাণ বেশি হলে এতে আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে এবং শেষে স্বাস্থ্যকর তেল, যেমন- রান্নায় কম তেল ব্যবহার করে সেদ্ধ, ঝোল, ভাপা খাবার বাড়ানো।
শেষ কথা
স্বাস্থ্য পরিচর্যায় অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য গঠনে আমরা কত কিছুই না করে থাকি। সঠিক তেল চিহ্নিত করাই সুস্থতার অন্যতম কারণ। তাই, সুস্থ থাকতে দৈনিক ৩/৪ চা চামচ ভোজ্য তেলই যথেষ্ট। অতিরিক্ত তেল গ্রহণ পরিহার করে স্বাস্থ্যকর তেল বেছে নিলে হৃদরোগ থেকে শুরু করে শারীরিক স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং মানবদেহের জন্য দৈনিক কতটুকু ভোজ্য তেল খেলে সুস্থ থাকা যায় সে সম্পর্কে বিশদ জানতে পেরেছেন। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।
comment url