সাজনার ডাল ভেবে খাচ্ছেন লাজনা, চেনার কৌশল জেনে রাখুন

সাজনার ডালকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Moringa Oleifera' যার সম্পর্কে আমরা কম বেশি সকলেই পরিচিত। তবে, সাজনার প্রকৃত ডাল সংগ্রহ করতে যেয়ে আমাদেরকে অনেকসময় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। আপনি কি সাজনার ডাল ভেবে লাজনা খাচ্ছেন? চেনার কৌশল কি সে সম্পর্কে ধারণা দিতে আজকের বিস্তারিত আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃমরিঙ্গার অজস্র উপকারিতা রয়েছে যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এটিকে সুপার ফুড হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। সাজনা গাছের পাতার পাশাপাশি সাজনার ডালের যে অসংখ্য গুনাগুণ রয়েছে তা অনেকেরই অজানা। তবে, সাজনার ডালের বদলে লাজনা খাচ্ছেন নাতো, বুঝবেন কিভাবে সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ টিপস আপনাদের সাথে শেয়ার করার মধ্য দিয়ে শুরু করছি।

সাজনা ও লাজনার কাণ্ড ও ডালের পরিচিতি

ক) সাজনা
সাজনার কাণ্ড লাজনার চাইতে তুলনামূলকভাবে শক্ত প্রকৃতির হয়। এর বাকল থেকে শুরু করে গাঁয়ের ছাল অনেকটা মসৃণ ও পাতলা প্রকৃতির হয়ে থাকে। নতুন অবস্থায় সাজনা গাছ অনেকটাই নরম প্রকৃতির হয়ে থাকে বলে এটির প্রতি যত্নবান হতে হয়। বিশেষকরে সাজনার ফুল লাজনার চাইতে অনেকাংশে বড় হয়ে থাকে। 
সংগৃহীত চিত্রঃ সাজনা ও লাজনার ফুলের ছবি।
আমাদের দেশে বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড়ের বাতাসে অন্যান্য গাছের চাইতে সাজনা গাছের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হতে দেখা যায়। তবে সাজনা গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি কিছুটা মোটা ও শক্ত প্রকৃতির হলে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্খা থেকে নিরাপদ থাকা যায়। বিশেষ করে গ্রামে গঞ্জে বাড়ীর আঙ্গিনায় বা যেকোনো উর্বর জমির ধারে সাজনা গাছের ডাল লাগিয়ে এর বৈচিত্র্যময় স্বাদকে উপভোগ করা যায়। অনেকেই সাজনার চাষকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করে থাকেন। সাজনার ডাল রোপণ করেই সাজনার আবাদ করা যায় বলে এটি চাষের ক্ষেত্রে তাই অর্থের অপচয় হয় না। সাজনা সুস্বাদু হওয়ায় তাই গ্রামে ও শহরাঞ্চলে অনেক উদ্দোক্তাই সাজনার গাছ লাগানো ও সাজনার ডাল বিক্রয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে দেখা যায়।

খ) লাজনা 
সাজনার কাণ্ডের চাইতে লাজনার কাণ্ড একটু নরম ও মোটা প্রকৃতির হয়ে থাকে। খুব দ্রুত বাড়ে কিন্তু সাধারণত শজনের মতো অতটা শক্তপোক্ত হয় না। শজনের মতো লাজনাগাছও ডাল থেকে চারা করা যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বীজ থেকে চাষ করা হয় লাজনা।

সাজনা ও লাজনার মধ্যকার পার্থক্য

নিত্যপন্যের কাঁচাবাজারে এখন সর্বত্রই চৈত্রের ভরা মৌসুমে সাজনা পাওয়া যাচ্ছে। অনেকসময় আমরা সাজনার ডাঁটা কিনতে যেয়ে ভুল করে লাজনা কিনে নিয়ে আসি। আকৃতিতে দেখতে অনেকটা একই প্রকৃতির মনে হলেও গঠন, স্বাদ ও ফলনের কথা চিন্তা করলে সাজনা ও লাজনার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। বিশেষকরে সুস্থ থাকতে ও সাজনার সঠিক স্বাদ পেতে সাজনা ও লাজনার পার্থক্য জেনে রাখা প্রয়োজন। সাজনা যেমন কম-বেশি আমরা সকলেই চিনে থাকি, পাশাপাশি লাজনার ডাল দেখতে প্রায় একই রকম হলেও কিছু জাতগত পার্থক্য তো রয়েছেই। আসলেই লাজনা সাজনারই একটি আধুনিক জাত। তবে, লাজনার দেহের গঠন, ফলন, গাছের আকৃতি ও চাষপদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে সাজনা ও লাজনার মধ্যে যে সকল পার্থক্য রয়েছে তা নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হল-
বিষয়বস্তু সাজনা লাজনা
উচ্চতা ও গঠনগত পার্থক্য সাজনার গাছ হয় উঁচু। লাজনার গাছ হয় খাটো ও ঝোপালো।
আকার ও আকৃতির পার্থক্য উচ্চতার দিক থেকে সাজনা গাছ ১০-১২ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। গাছের ডাল ওপরের দিকে বিস্তৃত হয়ে থাকে। লাজনার গাছ মূলত এক ধরনের ঝোপালো গাছ। যার উচ্চতা সাধারণত ৪-৬ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফল সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়।
চাষ পদ্ধতি সাজনার চাষ হয় মূলত ডাল রোপণের মাধ্যমে। মূলত বীজ রোপণের মাধ্যমে চাষ করা হয় লাজনা।

সাজনা ও লাজনার চাষের সঠিক সময়

ক) সাজনা 
১২ মাস জুড়ে সাজনার চাষ হয় বলে সাজনাকে মৌসুমি গাছ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই গাছের চাষের ক্ষেত্রে তেমন একটা বেগ পোহাতে হয় না বলে চাষীদের ক্ষেত্রে আগ্রহের কোন কমতি নেই। বিশেষ করে মৌসুমের বসন্তকালের ঠিক শেষের দিকে এই গাছের ফুল আসতে থাকে। সাড়া বছরের মধ্যে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এর ডাটা বাজারে উঠে। সাজনা গাছের ফুল হালকা সাদা অর্থাৎ ধূসর রঙের হয়ে থাকে। ফুল ফোটার সাথে সাথে গাছের সকল পাতা নিমিষেই ঝড়তে থাকে। পরবর্তীতে ফোঁটা ফুল থেকেই ফল (ডাটা) হয়। 
খ) লাজনা 
সাজনার মতোই ১২ মাস জুড়ে লাজনার চাষও হয়ে থাকে। সারা বছরে অন্তত ২ বার করে এর ফল (ডাটা) পাওয়া গেলেও অনেকসময় বছরের অন্যান্য সময়েও গাছে দেখতে পাওয়া যায়। লাজনা গাছ সাজনার চাইতে অনেক বৃহৎআকার হয়। খালি চোখে দৃষ্টি দিলেই লাজনার গাছ চিনতে পাড়া যায়। লাজনার ফুলের বিবরণ দিলে বলতে হয় এই গাছের ফুল সাজনার ফুলের চাইতে আকৃতিতে ছোট প্রকৃতির হয়। রং ও বর্ণের দিক থেকে এর রং গাঢ় ও ঘিয়ে হয়ে থাকে। উল্লেখ যে, লাজনা ফুলের পাপড়ির মধ্যবর্তীতে লাল দাগের আবরণ রয়েছে যাতে কোনটি সাজনার ফুল, কোনটি লাজনার ফুল সহজেই তা চিনতে পাড়া যায়। ফুল এলেও লাজনা গাছের পাতা ঝরে না বললেই চলে। গাছে সারা বছরই পাতা থাকে। তবে লাজনার গাছ লাগানোর ছয় থেকে আট মাসের মধ্যেই ফল দেখতে পাওয়া যায়।

সাজনা ও লাজনার আকৃতি

১। সাজনা
আকৃতির দিক থেকে সাজনা গাছের ডাঁটা হয় চিকন, পাতলা ও লম্বাটে। একেকটা সজনার দৈর্ঘ্য এক ফুট ও তার বেশিও হয়ে থাকে। সাজনার ডাঁটা আঁশযুক্ত হওয়ায় এটি খেতে অনেক সুস্বাদু হয়। বিশেষকরে সাজনার ডাঁটা হওয়ার শুরু থেকে পরিপক্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত সবুজ ও সতেজ থাকে বলে কৃষককুল এর চাষের প্রতি ঝোঁকে পড়তে দেখা যায়। 
২। লাজনা
আর লাজনার ডাঁটা সাজনার চাইতে মোটা আর খাটো আকৃতির হয়ে থাকে। এর ডাঁটাগুলো তুলনামুলকভাবে সাজনার চাইতে কম সুস্বাদু এবং কখনও আবার এর স্বাদে তেতু ভাব প্রকাশ পায়। বর্ণভেদে ডাঁটার রং কিছুটা ধূসর ও সবুজ রংয়ের হয়ে থাকে। এই ডাঁটা সাজনার চেয়ে বহুলাংশে মোটা আর হালকা বাঁকা প্রকৃতির হয়। বিশেষ করে লাজনার ডাঁটার ভেতরের অংশ নরম থালেও বাইরের অংশ অতিরিক্ত শক্ত হওয়ায় রান্না করলে পর্যাপ্ত শেদ্দ করার দরকার পড়ে। তবে সাজনা ও লাজনা ডালের ঔষধি গুনাগুণ কোনটি কোন অংশে কম নয়। বসন্তকালের নানাবিদ রোগবালাই থেকেও আমাদের হেফাজত করে থাকে শাজনা ও লাজনা।

স্বাদে ও গন্ধে সাজনা ডাঁটার উপকারিতা

স্বাদে ও গন্ধে সাজনা ডাঁটার রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। অনেকেই সাজনার ডালকে রুচিপূর্ণ হিসেবে মনে করে থাকেন। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বসন্ত আসলেই সাজনার ডাঁটা বাজারে ওঠতে শুরু করে। এই সময় সাজনার ডাটা দিয়ে রকমারি তরকারি রান্না করতে কতইনা ভালবাসেন রাঁধুনিরা। সাজনার ডাঁটা দিয়ে রান্না করা মজাদার রেসেপি আমাদের খাবারের তলিকায় সংযুক্ত করে স্বাদে ও গন্ধে প্রতিদিনের রান্না হয়ে উঠেছে তৃপ্তিময়। সাজনার ডাঁটার এমন কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে যা অনেকেরই অজানা। নিম্নে সাজনার ডাঁটার বেশকিছু পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা তুলে ধরা হল-
  • যারা বয়সের সাথে সাথে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাদের জন্য সাজনার ডাঁটা বেশ উপকারী হতে পারে। শরীরে যাদের অতিমাত্রায় এটি কোলেস্টেরল রয়েছে, এটি  কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী।
  • যারা খাবার খেলে বদহজমের সমস্যায় ভুগেন তাদের জন্য সাজনার ডালের তরকারী বেশ উপকারী। 
  • সাজনার ডাঁটায় যে পরিমাণে ভিটামিন-সি পাওয়া যায় তা আমাদের শরীরে একপ্রকার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন সময়ে ঠান্ডাজনিত জ্বর, সর্দি বা কাশি হলে সাজনার তরকারি বা স্যুপ তৈরি করে খেলে ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্যও সাজনার ডাল বেশ কার্যকরী। শরীরে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক্ষেত্রে সাজনার ডাল খুবই উপকারি।
  • সাজনার ডাঁটায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন জাতীয় উপাদান যা আমাদের হাড় গঠনে সহায়তা করে। বিশেষ করে মানবদেহের রক্ত পরিস্কার করতেও সাজনার বিকল্প নেই।
  • বসন্ত রোগ প্রতিরোধেও সাজনার বেশ উপকারিতা রয়েছে। সাজনার ডাঁটা দিয়ে রান্না করা তরকারি খেলে জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত হবার আশংকা অনেকটাই কমে যেতে থাকে।
  • সাজনার ডাঁটায় যে পরিমাণে আশঁ রয়েছে তা আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে খুবই উপকারি। 
  • যারা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন তাদের জন্য সাজনার ডাঁটা খুবই উপকারী।  সাজনার ডাঁটায় রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদেরকে অ্যালার্জি প্রতিরোধে ও অ্যালার্জির কারণে যে শ্বাসকষ্ট হয় তা থেকেও পরিত্রান দেয়।
  • সাজনার ডালে যে পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়াম থাকে তা আমাদের শরীর গঠনে সাহায্য করে থাকে।  বিশেষ করে সাজনার ডাল খেলে শরীরের দীর্ঘদিনের ব্যথা ও ক্লান্তির  ছাপ থেকে সহজেই পরিত্রান পাওয়া যায়।
  • আমাদের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ দুইটি অঙ্গ হল লিভার ও কিডনি। এই দুটি অঙ্গকে সুরক্ষিত রাখতে সাজনার ডাটা খাওয়ার বিকল্প নেই। শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে থাকে সাজনার ডাল। 

শেষ কথা

সঠিক খাদ্য চিহ্নিত করাই দেহের সুস্থতার অন্যতম কারণ। স্বাস্থ্য পরিচর্যায় অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য গঠনে আমরা কত কিছুই না করে থাকি। দেহের জন্য যেসকল খাদ্য আমাদের জৈবিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করে তার মধ্যে সাজনা ও লাজনার ডাল অন্যতম। সাধারণত, সাজনা ও লাজনার ডাল যেকোনো অঞ্চলেই সহজলব্য ও নানাবিদ পুষ্টিগুণে ভরপুর। মোটকথা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অমুল্য উপকারে আসছে এই সাজনা ও লাজনার ডাল। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং মানবদেহের জন্য সাজনা ও লাজনার ডালের অজানা উপকারিতার সম্পর্কে বিশদ জানতে পেরেছেন। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url