আম খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে কি উপকারিতা

ফলের মধ্যে আম জগৎ বিখ্যাত। স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় আম ছোট-বড় সকলের কাছেই অত্যন্ত পছন্দের একটি ফল। পছন্দের এই ফলটি অর্থাৎ আম খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে কি উপকারিতা সে সম্পর্কে ধারণা দিতে আজকের এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃবৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ এই চারটি মাস মূলত আম খাওয়ার মুখ্যম সময়। লেংরা, আম্রপালি, খিরসা ও আমের রাজা ফজলি বাজারে এখন ছয়লাভ। এই সময়কালীন আবাল বৃদ্ধবণিতা সকলেই আম খাওয়ার প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট হন। কিন্তু সুস্বাদু এই আম খাওয়ার প্রাক্কালে আমরা কি তা পানিতে ভিজিয়ে রাখি? আম খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে কি উপকারিতা নিম্নে বিস্তারিতভাবে কিছুটা ধারণা দেয়া হ'ল।

আম খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখার উপকারিতা বিস্তারিত

ক) আমের ক্ষতিকর আঠা দূর করতে পানিতে ডুবান

সাধারণত আমরা জানি, যেকোন ফল খাওয়ার আগে একটুকু ভিজিয়ে নিলে ফলের উপরিভাগের ময়লা অনেকটাই দূর হয়। অন্যান্য ফলের মধ্যে তুলনামূলক কষের পরিমাণ কম থাকলেও আমের মধ্যে তা থাকে পর্যাপ্ত। তাই, আম খেতে হলে খাওয়ার পূর্বেই আপনাকে তা দূর করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে, আপনাকে আমটিকে পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখার ফলে আমের ত্বকে লেগে থাকা ক্ষতিকর কষ নিমিষেই দূর হয়ে যায়। পাশাপাশি, আমের গায়ে জমে থাকা ধুলা-বালি পরিষ্কার হয়। আমের গাঁয়ে ক্ষতিকারক কীটনাশক জমে থাকলেও তা অনায়েশেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বিধায়, আম খাওয়ার আগে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এটি সুস্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। উপকারের মধ্যে আরও হল আম পানিতে ভিজিয়ে রাখার ফলে আমের মধ্যে থাকা থার্মোজেনিক দূরীভূত হয় ও শরীরকে গরম করার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। 

খ) আমের ময়লা ও বিষাক্ত উপাদান দূর করতে পানিতে রাখুন

বাজারে এখন হরেক রকমের আম উঠেছে। কিন্তু কোনটি ন্যাচারাল আর কোনটি ফরমালিনযুক্ত আম বুঝা মুশকিল। অত্যধিক ফলন পেতে আম চাষিরা আম বাগানে মুকুল আসার পূর্বেই বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করে থকেন। যার কারণে অনেকসময় আমের গায়ে ক্ষতিকারক কীটনাশক লেগে থাকে। এক্ষেত্রে, রাসায়নিক কীটনাশক মিশ্রিত আম খাওয়ার পূর্বে অবশ্যই তা দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে আমের মধ্যে থাকা জীবাণু ও খোসায় থাকা বিষাক্ত উপাদান অনেকাংশে দূর হয়ে যায়। 

গ) আমের তাপ নিঃসরণে ও শরীরের শিতলতায় আম পানিতে রাখুন

সাধারণত আম খেলে আমাদের শরীরবৃত্তিও ভিতরে ভিতরে গরম হতে থাকে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে শরীরে দেখা দেয় বদহজমের মতো সময়্যা, পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের দেখা দেয় ব্রণ। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, আমের মধ্যে যে থার্মোজেনিক-এর প্রভাব রয়েছে, তা দূর করতে আমকে অন্তত আধা ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এভাবে আম পানিতে ভিজিয়ে রাখলে আমে থাকা অতিরিক্ত তাপ যেমন কমতে থাকে আবার অন্যদিকে সেই আম গ্রহণ করলেও শরীর শীতল হয়।

ঘ) ফাইটিক অ্যাসিডের প্রভাব মুক্ত করতে আম পানিতে ভিজান

ফাইটিক অ্যাসিড আমের মধ্যে থাকা একপ্রকার অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট যা আমাদের শরীরের পুষ্টি গ্রহণে অর্থাৎ জিঙ্ক ও আয়রন শোষণে বাঁধা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপনি চাইলে আমের ডাটা ফেলে দিয়ে পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে অ্যাসিডের তীব্রতা কমতে থাকে এবং শরীর সহজেই পুষ্টি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

কেন আম পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন ?

কেন আম পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন এই বিষয়ে অনেকেরই মনে প্রশ্ন আছে। যেকোন ফল পানিতে ধুয়ে খাওয়ার বিষয়ে সুপ্রাচীনকাল থেকেই একই অভ্যাস চলে এসেছে। একটি সময় ছিল প্রাকৃতিক ফল-ফলাদিতে বিশেষ করে গবাদিপশুর মল দিয়ে প্রাকৃতিক জৈব সার প্রস্তুত করে তা গাছে ব্যবহার করা হতো এবং সেটি গাছের জন্য যেমন ভালো ছিল পাশাপাশি ফলের জন্যও ভালো। পুষ্টি ও গুণে সেই ফল শরীরের জন্যও ছিল স্বাস্থ্যকর। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সাথে চাষাবাদে এসেছে নতুনত্ব, এসেছে ভিন্নতা। আগে যেমন কৃষক যে কোন চাষের ক্ষেত্রে ভূ-পৃষ্টের মাটির উপরে নির্ভরশীল ছিল কিন্তু এখন ভূ-পৃষ্ট ছাড়াও ছাঁদ বাগানের চাষের পদ্ধতিও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ছাঁদ বাগানে যে কোন ফল চাষের ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে গাছকে পরিচর্যা করতে হয়, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক অথবা কীটনাশক দিতে হয়, সময় সময়ে টবের আগাছা পরিষ্কার করেও দিতে হয়। আবার এখন আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে বেশী ফলন পেতে ভূ-পৃষ্টে আম গাছের পরিচর্যা করতে, দ্রুত গাছে আম পেতেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও কীটনাশক আমরা দিয়ে থাকি। এইভাবে পাকা আমের মধ্যে যদি কীটনাশকের আধিক্য থাকে তাহলে সেই আম খেতে হলে অবশ্যই তা পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখাটা একান্ত আবশ্যক। তাই, কেন আম পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন তার বিষয়ে কিছু টিপস নিম্নোক্তভাবে দেখানো হলঃ-              

১) সাধারণত গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার সাথে সাথে আমের মাথার দিক থেকে কষ জাতীয় আঠা অনবরত বেড় হতে থাকে। একটি সময় আমের কষ পড়া বন্ধ হয়ে যায়। দেখা যায় আম থেকে নির্গত কষ শুকিয়ে আমের উপরিভাগে লেগে থাকে। পুষ্টিবিদের মতে, এই কষ ত্বক ও পেটের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। ফলে, আম খাওয়ার পূর্বে আমের ত্বকের কষ ভালো করে দূর করে খাওয়াই উত্তম। 
২) আমের ত্বকে লেগে থাকা বালি ও মাটি পরিষ্কার করতে আমরা নানারকম পন্থায় চেষ্টা করে থাকি। বাগান থেকে আম পাড়ার পর তা বাজারে নিয়ে আসতে আসতে আমের গায়ে কিছুটা ধুলাবালি ও ময়লা লেগে যায়। তাৎক্ষনিক আম পরিস্কার করা হলেও গাঁয়ের ময়লা দূর করা সম্ভব হয় না। তাই, আপনি এই পরিস্থিতিতে ডুবানো পানির মধ্যে দীর্ঘসময় ধরে আম ভিজিয়ে রাখলে আমের গাঁয়ে লেগে থাকা ময়লা নরম হতে থাকে, যার কারণে আম পরিস্কার করতে তেমন একটা বেগ পোহাতে হয় না।

৩) পানিতে ভিজিয়ে আম নরম করা একটি সনাতন পদ্ধতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাজার হতে আনা আমের শাঁসের মধ্যে কাঁচা কাঁচা ভাব অথবা শক্তভাব রয়ে যায়। এজাতীয় আমকে যদি আপনি খাওয়ার পূর্বে একঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে পারেন তাহলে এর ভিতরের শাঁস অনেকাংশে নরম হবে ও আম খাওয়ার ক্ষেত্রেও তৃপ্তিময় হতে পারে। তীব্র গরমে এজাতীয় নরম আমের শরবত অনেকের কাছেই এখন পছন্দের শীর্ষে পরিণত হয়েছে।

৪) আমাদের মধ্যে যাদের শরীরে অ্যালার্জির তীব্রতা রয়েছে তারা যদি আম খেতে চান তাহলে অবশ্যই আমকে খাওয়ার আগে খানিকটা ভিজিয়ে নিন। এতে করে আমের মধ্যে থাকা অ্যালার্জির মাত্রা অনেকটাই কমে যেতে থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, আমের খোসা আর বোঁটার মধ্যে যে অ্যালার্জির উপাদান নিহিত থাকে যা দূর করতে ভিজিয়ে রাখাটা একান্ত জরুরি।

পানিতে আম ভিজিয়ে রাখার সঠিক নিয়ম

আমের মৌসুমে আপ্যায়নে এখন আম ছাড়া কোন কিছু ভাবাই যায় না। যেকোন ফল বিশেষকরে খাওয়ার আগে পানিতে ভাল করে ধুয়ে খেতে হয়। আমের ক্ষেত্রে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু খাওয়ার আগে প্রতিক্ষেত্রে আম পানিতে ভিজিয়ে রাখাটা তেমন একটা জরুরি নাও হতে পারে। তবে এটি ফল পরিষ্কার থেকে শুরু করে, ফলের রাসায়নিক উপাদান দূর করতে টুটকা সমাধান দিতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য আম পানিতে ভিজিয়ে রাখলেও আমের ত্বক নরম হয়, যার ফলে আমের খোসা ছিলতে ও আম কাটতে কিছুটা সহজ হয়। বিশেষ কোন কারণ ছাড়া সাধারণত খাওয়ার আগে আধা ঘণ্টা অথবা ১ থেকে ২ ঘণ্টা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানির মধ্যে আম ভিজিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন পুষ্টিবিদরা।

শেষ কথা

সুস্থতায় বড় নিয়ামত। সুস্থ থাকতে আমাদেরকে খাবার জীবাণুমুক্ত তথা রাসায়নিক দ্রুবন পরিহার করে খাওয়াই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। তাই, সুস্থ থাকতে উপযুক্ত খাবার নির্ণয়ের পাশাপাশি শরীরের ওজন ও স্থুলতা নিয়ন্ত্রণ রাখাটাও বিশেষভাবে জরুরি। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং আম খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে কি উপকারিতা, সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও ধারণা দিতে পেরেছি। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url