আম খাওয়ার কারণে কি আসলেই ওজন বাড়ে, জেনে রাখুন
আম স্বাদ ও গুণে অতুলনীয় হওয়ায় ছোট-বড় সকলের কাছেই খুবই পছন্দের ফলের মধ্যে একটি। মূলত মে-জুন মাসে বাজারে হরেক রকমের রসালো আমের সমাহার ঘটে থাকে। কিন্তু আম খাওয়ার কারণে কি আসলেই ওজন বেড়ে যেতে পারে, সে সম্পর্কে জানতে ও জানাতে আজকের আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃসাধারণত বছরের একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে আমের চাহিদা অত্যধিক থাকে। আম পছন্দ করেননা এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া আসলেই দুস্কর। দেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে আম একটি যুগান্তকারী ফল হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। পুষ্টিবিদদের ধারণা, আম খাওয়ার কারণে যে ওজন বাড়ে এমন ধারণা নিতান্ত সত্য হলেও এটি নির্ভর করে থাকে আম খাওয়ার পরিমাণ ও আম খাওয়ার তৎপরবর্তী জীবন ব্যবস্থার উপর। নিম্নোক্তভাবে চলুন জেনে নেই, আম খাওয়ার কারণে কি আসলেই ওজন বাড়ে?
আম খাওয়ার কারণে কি আসলেই ওজন বাড়ে?
পৃথিবীর অনেক সুস্বাদু ফলের মধ্যে আম একটি পছন্দের ফল। প্রাকৃতিক ক্যালোরি ও শর্করায় ভরপুর থাকলেও আমে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো পুষ্টি উপাদান যা আমাদের দেহের শক্তির উপরন্তু উৎস। বাজারে বিভিন্ন প্রজাতির আম পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে গোপাল, খিরসা, আম্রপালি, ল্যাংড়া অন্যতম। প্রায় সব আমই রসালো অর্থাৎ স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়। যার কারণে ফলের রাজা আম এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা শারীরিক ওজন নিয়ে সচেতন তারা আম খেয়ে একটু চিন্তাযুক্ত থাকেন যে, আমের কারণে কি ওজন বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে চলুন বিস্তারিত আলোকপাত করি।
ক) আমের ক্যালোরি ওজন বাড়ায়
একটি মিডিয়াম সাইজের আমের মধ্যে ক্যালোরি রয়েছে ১২০ থেকে ১৫০ গ্রাম। যার মধ্যে গ্লুকোজের পরিমাণ থাকে প্রায় ৪৬ গ্রাম। আমের মধ্যে যে পরিমাণে ক্যালোরি থাকে আপনি যদি অতিমাত্রায় তা খান তাহলে আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, যার ফলে আপনার যদি দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস থাকে তাহলে রক্তে শর্করা বাড়ার কারণে ডায়াবেটিস এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, পাশাপাশি অনাকাঙ্খিত ওজনও বেড়ে যেতে পারে। তাই, আমের মৌসুমে আপনার উচিৎ হবে প্রয়োজনুপাতে আম খাওয়া। ক্যালোরি বার্ন করতে হলে এই সময় নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা ও সতর্ক থাকা। পুষ্টিবিদদের মতে, অল্প পরিমাণে আম খাওয়া গেলে ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসে।
খ) শারীরিক শক্তি জোগাতে আমের চিনি
শারীরিক শক্তি জোগাতে আমের চিনি খুবই কার্যকরী। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত চিনি খেলেও রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। চিনির মধ্যে থাকা ক্যালোরি যা শরীরে জমে একটিপর্যায়ে চর্বিতে রুপান্তরিত হতে থাকে। এই চর্বি রক্তে জমাট বেঁধে শরীরে স্ট্রোকের ঝুঁকিসহ নানাবিদ সমস্যা তৈরি করে যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক। অনেকেই আছেন আমের মৌসুমে একনাগারে অত্যধিক আম খেতে পছন্দ করেন। আবার অনেকেই আছেন আম দিয়ে বিভিন্ন মুখরচক খাবার বানিয়ে ডেজার্ট আইটেম হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক বিশেষ দিনগুলোতে পরিবেষন করে থাকেন বিধায় আম অত্যধিক খাওয়ার ফলেও এক্ষেত্রে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
গ) মোটা হওয়ার কারণ কি পাকা আম?
আমরা কম বেশী সকলেই স্বাস্থ্য সচেতন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা মনের অজান্তেই অত্যধিক ক্যালোরিযুক্ত খাবার খেয়ে থাকি। আমে যে পরিমাণে ক্যালোরি থাকে তা অতিমাত্রায় শরীরে প্রবেশ করার ফলেও আপনি মোটা হওয়ার আশঙ্কায় পড়তে পারেন। অতিরিক্ত স্থুলতা ও ওজন বৃদ্ধিই মোটা হওয়ার মৌলিক কারণ। তাই আমের মৌসুমে আমাদের শরীরের আলাদা যত্ন নিতে হবে, যাতে করে অতিরিক্ত আম খাওয়ার ফলে আমার অসুস্থ্য না হয়ে পড়ি। এই সময় শরীরের জন্য আলাদা ডায়েট ঠিক রাখাটা একান্ত জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, যারা অতিরিক্ত ওজনের কারণে স্থ্যুলতায় ভুগেন তাদের অবশ্যই ডায়েটের ক্ষেত্রে পরিমিত আম খাওয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।
ঘ) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় আম
আম খাওয়ার কারণে যদি শরীরে ওজন বা স্থ্যুলতা বাড়ে কিন্তু পাশাপাশি আম খাওয়ার কারণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপনি কাঁচা বা পাকা আম যেভাবেই খান উভই পদ্ধতিই শরীরের রোগ প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী। আমে রয়েছে ভিটামিন-এ, সি, ফাইবারসহ বিভিন্ন প্রকৃতির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহের শক্তির উৎস। চিকিৎসকের মতে, উল্লেখিত ভিটামিন উপাদান আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সৃষ্টিতে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। আমাদের মধ্যে যাদের বদহজমের সমস্যা রয়েছে, কিছু খাবার খেলেই গ্যাসের উপদ্রপ হয়ে থাকে তাদের বিশেষ করে আমে কোন প্রকার তেল জাতীয় উপাদান না থাকায় বেশী পরিমাণে গ্রহণ করলেও গ্যাস্ট্রিক ও বদহজমের সমস্যা ওতটা পুহাতে হয় না। তবে, এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের জন্য দৈনিক ১ থেকে ২ পিচ আম খাওয়াই শ্রেয়। অল্প পরিমাণে খেলেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি যায় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে জমাট হতে দেয় না।
ঙ) প্রতি ১০০ গ্রাম আমে কত ক্যালরি থাকে?
আম একটি ক্যালোরি সমৃদ্ধ ফল। এই ফলের মধ্যে যে পরিমাণে ক্যালোরি থেকে থাকে তা আমাদের মানবদেহের জন্য খুবই উপকারি। গবেষণালব্দ থেকে জানা যায়, আমের ওজন যদি ১০০ গ্রাম হয় তাতে ক্যালোরির পরিমাণ থাকে ৭৯-৮২ গ্রাম ভাগ। কিন্তু আমের জাত ও মিষ্টি ভেদে ক্যালোরির পরিমাণের মধ্যে অনেকটা ভিন্নতা দেখা যায়। তাছাড়া, অন্যান্য উপাদানের মধ্যে শর্করার পরিমাণ থাকে ১৭ গ্রাম, ফাইবার বা আঁশ থাকে ৪ গ্রামের মত, ভিটামিন-এ থাকে ২৩০০ মাইক্রোগ্রাম এর চাইতে বেশি। একই সাথে পটাশিয়াম ও ভিটামিন-সি তো থাকছেই।
চ) দৈনিক কয়টি আম খেতে মানা নেই
ক্যালোরি আমাদের শরীরের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। প্রাপ্তবয়স্ক একজন সুস্থ মানুষের জন্য আনুমানিক ২০০০ এর মতো ক্যালোরির প্রয়োজন হয়। একটি পরিপূর্ণ আমের মধ্যে যে পরিমাণ ক্যালোরি থাকে তা আমাদের মোট ক্যালোরির ১৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। সুস্থ থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ হচ্ছে, আম যখনই খাবেন পরিমিত খাবেন এবং পরিমাণের দিক থেকে একটি বড় আমের অর্ধেক বা আনুমানিক ১৫০ গ্রাম খাওয়াই উত্তম। হেলথ বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে আম কখনই প্রতিবন্ধক হতে পারে না। তবে, আম খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হয়। কিন্তু কোন উপায়ে সেটি করবেন তা আপনার আম খাওয়ার পরিমাণের উপর নির্ভর করে অনেকটাই।
ছ) আম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
প্রতিটি ফলের কিছু নির্দিষ্ট উপকারিতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আম তার বাহিরে নয়। কিন্তু এই আমের নির্যাস গ্রহণে আপনি যদি কোন নিয়মকে তোয়াক্কা না করে খেতে থাকেন তা এক সময় আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। নিম্নে উপকারিতা ও অপকারিতা কি জেনে নিন-
১। উপকারিতা
আম সকলের কাছে অত্যন্ত পছন্দের একটি ফল। আমেরও নিজস্ব কিছু উপকারিতা রয়েছে। পরিমাণ মতো আম খেলে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। পাশাপাশি চোখ ও ত্বকের যত্নেও আম বিশেষভাবে উপকারি।
২। অপকারিতা
আমের যেমন অনেক উপকারিতা রয়েছে, আবার কিছু অপকারিতাও রয়েছে। আম মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় যাদের অতিমাত্রায় ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের আম খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। স্থ্যলতা বৃদ্ধি হওয়ার প্রবণতা, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া ও হটাৎ পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে আমের কারণে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আম বেশি পরিমাণে খেলেও মুখমণ্ডলে একধরনের র্যাশ অথবা অ্যালার্জির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
কিছু পরামর্শ
আমের মৌসুমে আম খেতে কার না ইচ্ছ করে। তবে, আম খাওয়ার আগে সেটিকে খানিকটা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন ও জীবাণুমুক্ত করুন। বেশিক্ষণ ভেজানোর কারণে আমের ভেতরের গরম ভাব অনেকটাই বের হতে সহজ হবে ও যদি ক্ষতিকর মেডিসিন থাকে তা দূরীভূত হবে। একজন সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক ১টি আমের অর্ধেক বা মাঝারি আকৃতির আম খাওয়াই উচিৎ হবে। আম বিশেষ করে খালি পেটে না খেয়ে ভরা পেটে খাওয়ার চেষ্টা করুন। দুপুরে ভরা পেটে খাওয়ার পর অথবা সকালের নাশতায় আম খাওয়া খুবই উত্তম। কিন্তু রাতে আম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন কারণ এটি সুসাস্থের জন্য হানিকর। অন্যান্য খাবারের মধ্যে যেদিন আম খাবেন সেদিন ভাত ও রুটি খাওয়ার পরিমাণ খানিকটা কমিয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের আম খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিত খাওয়ার দিকে দৃষ্টি রেখে সচেতন থাকাটা একান্ত জরুরি, নচেৎ অতিমাত্রায় আম সেবনের ফলেও ডায়াবেটিস বেড়ে যেতে পারে, যা আপনাকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
শেষ কথা
সুস্থতায় বড় নিয়ামত। সুস্থ থাকতে আমাদের সঠিক খাবার নির্ণয় করাই প্রধান কাজ হওয়া উচিৎ। সুস্থ থাকতে ওজন ও স্থুলতা নিয়ন্ত্রণ রাখাটা বিশেষভাবে জরুরি। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং আম খাওয়ার কারণে কি আসলেই ওজন বাড়ে, সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই কিছুটা হলে ধারণা দিতে পেরেছি। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।
comment url