গরমে প্রশান্তির খাবারগুলো কি কি? জেনে রাখা ভালো
দিন দিন গরমের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। গ্রীষ্মকাল এলেই অসহনীয় গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। কিভাবে তীব্র এই গরমে নিজেকে খাপখাওয়াবেন, শরীরকে শীতল রাখতে প্রশান্তিদায়ক খাবার খাবেন সে জানতে এবং জানাতে আজকের বিস্তারিত আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ষড়ঋতুর দেশ। কাল ও পাত্রভেদে এই দেশের ঋতু সময়ে সময়ে কিছুটা তারতম্য হলেও শীতকাল যেমন বছরের ৩ মাস থাকে, পাশাপাশি ঋতুরাজ বসন্তের পরেই এসে যায় গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ গরমকাল। বাংলা বৈশাখ মাসের তীব্র তাপদাহে আমাদের অস্থির জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এই সময় গরমে সুস্থ থাকতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কিছুটা পরিবর্তন আনাটা বিশেষভাবে জরুরি। চলুন বিস্তারিত জেনে নেই।
পেজ সূচিপত্রঃবিশেষ করে, গরমে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিৎ যা আমাদের দেহে আনে প্রশান্তি। গরমে প্রশান্তির খাবারগুলো কি কি হতে পারে সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে নিম্নে আপনার জন্য তুলে ধরা হল-
গরমে প্রশান্তির খাবারগুলো কি কি?
গরমে প্রশান্তির জন্য অর্থাৎ কিছুটা স্বস্তির জন্য আমরা কত কিছু প্রয়োগ করেই চেষ্টা করে থাকি। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নিয়ে আসি নানান খাবারের সমাহার। গরমের প্রখরতা বাড়ার সাথে সাথে নিজের শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখাটাও বিশেষভাবে দরকার। তাই, খাবারের তালিকার মধ্যে এমন কিছু খাবার রয়েছে যা ন্যাচারালি আপনার তপ্তময় শরীরকে একটু প্রশান্তি দিতে ও শরীরে লবনাক্ত পানির ঘাটতি রোধ করতে কার্যকরী উৎস হতে পারে। গরমে একটু প্রশান্তি পেতে নিম্নোক্ত খাবারগুলো আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন-
ক) শসা
গরমে প্রশান্তির খাবারের তালিকার মধ্যে অন্যতম হল শসা। শশা এমন একটি সবজি যা আপনার দেহের ৯৫ ভাগ পানির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে থাকে। শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে ও দ্রুততম সময়ে প্রশান্তি আনয়নে শশা খাওয়ার বিকল্প নেই। শসার আরও বিশেষ কিছু উপকারিতার মধ্যে একটি হল শরীরকে হাইড্রেট করা থেকে বিরত রাখে এবং অন্যটি হল শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
খ) তরমুজ
ফলের প্রতীক, তরমুজ শুধু সুস্বাদু নয় অবিশ্বাস্যভাবে হাইড্রেটিংও বটে। শসার ন্যায় গরমে সাধ্যমতো তরমুজ খেলেও আপনার শরীরকে প্রশান্তি দিতে পারে। তরমুজে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় উপাদান যা আপনার শরীরকে পানির অভাব পূরণ করতে কার্যকরী উৎস হিসেবে কাজ করে। তরমুজের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা গরমে ক্লান্ত শরীরকে দ্রুত প্রশমিত করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এই ফলটিতেও ৯০ ভাগের মতো পানীয় বিদ্যমান থাকে। ভিটামিন-'A', 'C' তে পরিপূর্ণ তরমুজ শরীরের রোগ প্রতিরোধেও কাজ করে থাকে। তাই, গ্রীষ্মকালে গরমের মধ্যে শরীরকে প্রশান্ত করতে তরমুজ পিস করে অথবা সরবত করে খেলে আপনার শরীরের ঘামের মাধ্যমে ভাস্প হয়ে যাওয়া নিঃসৃত জলীয় এর তরল ইলেক্ট্রোলাইটগুলি পূরণ করতে ও শরীরকে প্রয়োজননুপাতে ঠান্ডা রাখতে কাজ করে।
গ) লেবু বা লেবুর সরবত
গ্রীষ্মকালে গরমে শরীরকে তরতাজা রাখতে তরমুজের পাশাপাশি লেবু একটি কার্যকরী উৎস। লেবুর মধ্যে ভিটামিন-সি ও ইলেক্ট্রোলাইট জাতীয় এমন উপাদান অন্তর্নিহিত রয়েছে আমাদের শরীরকে দ্রুত ফ্রেশ করতে ও ঠান্ডা রাখতে যুগান্তকারী হিসেবে কাজ করে। লেবুতে রয়েছে সাইট্রিক অ্যাসিড যা আপনার শরীরকে ঠাণ্ডা রাখা সহ শরীরের কাটা ছেঁড়া ও ঘা দ্রুত সাড়তে কাজ করে। তাই, গরমের মধ্যে শরীরকে প্রশান্তি দিতে আপনি চাইলে লেবু বা লেবুর সরবত প্রাত্যহিক পান করতে পারেন।
ঘ) বেলের শরবত
বেল হচ্ছে একপ্রকার ভেষজ ফল, যাতে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে। এই তীব্র গরমে শরীরকে প্রশমিত করতে লেবুর পাশাপাশি আরও একটি ফল কার্যকরী উৎস হতে পারে তা হল বেলের সরবত। প্রতি ১০০ গ্রাম বেলে রয়েছে আনুমানিক ৬০ থেলে ১০৫ গ্রাম ক্যালোরি, ১.৮ গ্রাম প্রোটিন, ৮ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি, ২৫ থেকে ৩১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও বেলে রয়েছে ভিটামিন-এ, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। বেলের সরবত আপনার শরীরের যেমন হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উন্নত করে এবং পাশাপাশি এটি আপনার শরীরকে দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা রাখতেও কাজ করে থাকে। আমাদের যকৃতের জন্য বেল যেমন উপকারী তেমনি শরীরের পুষ্টি পূরণেও বিশেষভাবে উপকারী।
ঙ) সবজি
বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমাদেরকে গরমে আমিষ জাতীয় খাদ্য পরিহার করে সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিৎ। বছরের অন্যান্য সময়ের মতোই গরমকালেও বাজারে হরেকরকমের সবজি বিক্রয় হয়ে থাকে। আপনার পছন্দ মতো পানির ভাগ বেশী এমন সবজিই আপনাকে দিতে পারে প্রশান্তির ছায়া। গরমকালে বাজারে যে সকল পানি জাতীয় ঠাণ্ডা প্রকৃতির সবজি হাতের নাগালে পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হল যেমন-লাউ, ঝিঙা, পালং শাক, পুঁই শাক, চিচিঙ্গা ইত্যাদি আপনি পেতে পারেন এবং সবজির বাজার থেকে প্রয়োজননুপাতে তা সংগ্রহ করেতে পারেন। বিশেষকরে এই গরমে টাটকা সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাটাই উত্তম। অতিরিক্ত সবজি সংরক্ষণ করতে যেমন আপনাকে অসুবিধায় পড়তে হয়, তেমনি দ্রুত তা পচনশীলও বটে। তাই, গরমে শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে প্রশান্তিদায়ক খাবারগুলো মধ্যে প্রয়োজননুপাতে সবজি খাওয়ার অভ্যাসই আপনাকে দিতে পারে আনন্দদায়ক অনুভূতি।
চ) টক/টক মিষ্টি দই
গরমের দিনে শারীরিক প্রশান্তি আনয়নে আপনি খাবারের মেন্যুতে টক/টক মিষ্টি দই অন্তরভুক্ত করতে পারেন। নানাবিধ পুষ্টিকর উপাদানে ভরপুর টক স্বাদে ও গুণে অনন্য। শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টোরেল নিয়ন্ত্রণে, হজম শক্তি বৃদ্ধিতে, লিভার ভালো রাখতে, শরীরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টক/টক মিষ্টি দইয়ের উপকারিতার জুড়ী নেই। দই মূলত প্রোবায়োটিক জাতীয় খাবার যা আমাদের এনজাইম তথা হজমের প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে এবং শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য ঠিক রাখতে সহায়তা করে। তাই, তীব্র গরমে শরীরকে প্রশান্তি দিতে এক বাটি বা গ্লাসে করে টক/টক মিষ্টি দই খেলে আপনার শরীরকে দ্রুত প্রশান্তি দিতে সক্ষম। টক/টক মিষ্টি দই ঠাণ্ডা বা নরমাল প্রকৃতির যেকোনভাবেই আপনি খেতে পারেন। তবে, এই অসহ্য গরমে আপনি ঠাণ্ডা করেই টক/টক মিষ্টি দই খেলে প্রশান্তির ভাগ দিগুন বেড়ে যাবে।
ছ) কচি ডাবের পানি
গরমে প্রশান্তির ভাগ দিগুন করতে খাবারের ম্যনুতে কচি ডাবের পানি একটি কার্যকরী উৎস হতে পারে। ডাবের পানির রয়েছে নানাবিদ পুষ্টিগুণ যা আমাদের শরীরকে জটিল রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে কচি ডাবের পানিতে রয়েছে প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট যা আপনার শরীরকে দ্রুত সতেজ করতে কাজ করবে। একজন সুস্থ ব্যক্তির জন্য সপ্তাহে অন্ততঃ একটি করে কচি ডাব খাওয়া উচিৎ। ডাবের পানিতে যে পরিমাণে প্রাকৃতিক খনিজ লবণ রয়েছে তা আমাদের এই গরমে শরীর থেকে বেড় হয়ে যাওয়া লবণাক্ত গামের ঘাটতিকে পূরণ করতে সক্ষম। কচি ডাবের পানি কেবল হাইড্রেটিং উপাদান নয় বরং পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম উপাদানেও সমৃদ্ধ। যা আমাদের শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ও বিশেষকরে ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যকে ঠিক রাখতে কচি ডাবের পানি বিশেষভাবে অবদান রাখছে। এই গরমে শরীরকে কিছুটা ঠান্ডা প্রশান্তি দিতে কচি ডাবের বিকল্প নেই।
জ) পুদিনা পাতা
আমরা কম বেশী সকলেই বাড়ীর আঙ্গিনায় অথবা ফ্ল্যাটের বারান্দায় ছোট্ট টবে পুদিনা পাতার গাছ লাগিয়ে থাকি। গরমে শরীরকে প্রশান্তি দিতে পুদিনা পাতাও হতে পারে আপনার জন্য উৎকৃষ্ট উৎস। আমাদের অনেকেই পুদিনা পাতা ভাঁজাপোড়ায় খেতে পছন্দ করেন। তবে পুদিনার রস সাস্থের জন্য খুবই উপকারী। শরীরকে দ্রুত শীতল করতে পুদিনা পাতার জুড়ী নেই। তাই, চা অথবা শরবতের সঙ্গে পুদিনা পাতা মিশিয়ে বা রস মিশিয়ে খেলে গরমের ক্লান্তি দূর করতে ও শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে শরীরকে শীতল করতে কার্যকরী সমাধান হতে পারে।
শেষ কথা
গরমে স্বাস্থ্য পরিচর্যায় অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য গঠনে আমরা কত কিছুই না করে থাকি। বিশেষকরে গরমে শরীরে প্রশান্তি আনতে সঠিক খাবার নির্ণয় করাই সুস্থতার অন্যতম কারণ। তাই, তীব্র গরমের মধ্যে আপনার পছন্দের খাদ্য তালিকায় উপরোক্ত খাবারগুলো যদি সন্নিবেশিত করে কিছুটা উপকারে আসে তাহলেই আমাদের সার্থকতা। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং গরমে প্রশান্তির খাবারগুলো সম্পর্কে বিশদ জানতে পেরেছেন। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।
.webp)
আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।
comment url