বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করা কি ঠিক? কান পরিস্কারের সঠিক পদ্ধতি

বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করার ধারণাটি সুপ্রাচীন কাল থেকে মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণার উপর মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাচ্চাদের কান পরিস্কারের বিষয়ে এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্রিয় স্রোতা, বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করা কি ঠিক? কান পরিস্কারের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিতে আজকের আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
পেজ সূচিপত্রঃশিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, পৃথিবীর আলো দেখে ঠিক তখন থেকেই আমাদের নানান জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। বাচ্চার পরিচর্যায় নানান উৎসাহ উদ্দিপনা কাজ করে। কিন্তু শিশুর পরিপূর্ণ যত্ন নিতে গিয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে না জেনে আমরা অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার উপকারে আসে আবার কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার জন্য হানিকর হয়ে থাকে। তেমনি বাচ্চাদের কান পরিস্কার করা নিয়ে অনেকেই অনেক প্রশ্ন করে থাকেন, কান পরিষ্কার করা আদৌ ঠিক কি-না জানতে চান। নিম্নোক্ত বিশ্লেষণে বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করা ঠিক কি-না সে বিষয়ে কিছু ধারণা দেয়া হলঃ-

বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করা কি ঠিক?

আমরা অনেকে সময় কিছু ভ্রান্ত ধারণার উপর বশবর্তী হয়ে বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করে থাকি।চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, বাচ্চাদের কানের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা অর্থাৎ কানের গভীরে পরিস্কার করা মোটেই উচিৎ নয়। এতে করে কানের ভিতরের অংশে থাকা কানের খইল (Earwax)  পরিষ্কার করতে গিয়ে কানের পর্দায় আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে, যা বাচ্চার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কানের খইল বিশেষকরে বাচ্চাদের কানকে বড় ধরণের সংক্রমণ হওয়া থেকে বাঁচায় যার কারণে বাচ্চাদের কানের খইল পরিষ্কার না করাই শ্রেয়। কানে খইল জমা হলে সেটি প্রাকৃতিকভাবেই বের হয়ে আসে। বিধায়, শিশুর কান পরিস্কারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসাই শিশুর জন্য উচিৎ হবে। তবে, ছোটদের কিংবা বড়দের ক্ষেত্রে কান পরিস্কারের কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয় যা নিম্নে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হল। 

কান পরিস্কারের সঠিক পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কান পরিষ্কার করার কিছু সঠিক পদ্ধতি রয়েছে যা না জানার ফলে আপনার হতে পারে বিপদ। নিম্নে কান পরিস্কার করার কিছু আধুনিক ও যুগোপযোগী টিপস তুলে ধরা হল আপনার কান পরিস্কারের ক্ষেত্রে কাজে আসবে।

ক) কানের বহিরাংশ পরিচ্ছন্ন রাখা

প্রাথমিকভাবে কান পরিস্কার রাখার ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই কানের বহিরাংশ পরিস্কারের দিকে কিছুটা দৃষ্টি দিতে হয়। এক্ষেত্রে গোসল করার সময়কে আপনি বেঁছে নিতে পারেন। গোসলের মধ্যবর্তী একটি সময় আপনি ইচ্চা করলে খানিকটা কুসুম কুসুম গরম পানিতে নরম তোয়ালে দিয়ে কানের বাইরের অংশ আলতোভাবে পরিস্কার করে মুছে নিন। প্রতিদিন এইভাবে নিয়ম করে কানের বহিরাংশ পরিস্কার রাখলে আপনার কানের ভিতরে দ্রুত ময়লা হওয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। 

খ) কানের গভীরে পরিস্কারে সচেতনতা

কানের একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট হল সে সবসময় নিজেই নিজেকে পরিষ্কার রাখতে সক্ষম। যারজন্য আলাদাভাবে পরিস্কারের ক্ষেত্রে কোন পন্থার আস্রয় নিতে হয় না। প্রাকৃতিকভাবেই তা নির্বাহ হয়ে থাকে। অনেকেই কানের গভীরে পরিস্কার করতে চান। পরিস্কার করতে গিয়ে অনেকসময় দেখা যায় অনাকাঙ্খিতভাবে পর্দায় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তা ইনফিকশনে রূপ নেয়। তাই, কানের গভীরে পরিস্কারে সচেতন হওয়াটা একান্ত জরুরি।

গ) শিশুর কানের নালী পরিস্কারে কটন বার্গের ব্যবহার

আপনার শিশু কি কান্না করছে, আপনি কি চিন্তিত, আপনার কি মনে হচ্ছে শিশুর কানে ব্যথা, শিশুর কানের নালীতে জমে আছে খইল? কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তাৎক্ষণিক কটন বার্গ দিয়ে শিশুর কানের গভীরে কান পরিস্কারের চেষ্টা করছেন। এটি কখনই করতে যাবেন না। বিশেষ করে বাচ্চাদের কানের ভিতর কটন বার্গ অথবা এজাতীয় অন্য কোন বস্তু প্রবেশ করানো অত্যন্ত ক্ষতিকারক হতে পারে। এতে করে বাচ্চাদের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার আশঙ্খা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি কটন বার্গ ব্যবহারের কারণে ময়লা আরও গভীরে যেয়ে একটি পর্যায়ে তা শ্রবণে ব্যাঘাত ঘটিয়ে শ্রবণ শক্তিকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিতে পারে।

ঘ) বাচ্চাদের কান পরিস্কারে নরম ওয়াশক্লথের ব্যবহার

বাচ্চাদের কান সাধারণত সেন্সেটিভ প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাই, কান পরিস্কারের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কিছু বিষয়ের প্রতি সচেতন হওয়া একান্ত আবশ্যক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বাচ্চাদের কান অত্যধিক নরম হওয়ায় তাতে কিছু দিয়ে স্পর্শ করতে গেলে অবশ্যই সেটি নরম প্রকৃতির বস্তু হতে হবে। শক্ত জাতীয় কাপড় দিয়ে স্পর্শ করলে কানের আবরণে রেশ হওয়ার আশঙ্খা দেখা দিতে পারে। তাই, এক্ষেত্রে আপনি বাজারে অথবা অনলাইনের মাধ্যমে পেতে পারেন এমন কিছু নরম ওয়াশক্লথ বা নরম তোয়ালে যা আপনার বাচ্চার জন্য আরামদায়ক হতে পারে। অর্থাৎ, কান পরিস্কারে ও ময়লা অপসারণে নরম ওয়াশক্লথ এবং উষ্ণ গরম জলের সংমিশ্রণ কৌশলটি এক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে। 

# কান পরিস্কারে নরম ওয়াশক্লথ ও উষ্ণ জল প্রস্তুত প্রণালীঃ

প্রথমত আপনি নরম ওয়াশক্লথটিকে উষ্ণ হালকা গরম জলের মধ্যে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নিন। ওয়াশক্লথটি ভালোভাবে ভিজানো শেষ হলে তা চিবিয়ে পানি সরিয়ে নিয়ে তৎপরবর্তীতে বাহির হওয়া খইলগুলোকে আলতভাবে ওয়াশক্লথ দিয়ে স্পর্শ করে পরিষ্কার করে নিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাচ্চাদের কানের ময়লা এমনিতেই বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। বেরিয়ে আসতে দেখলে একই প্রক্রিয়ায় তা আস্তে আস্তে করে কানের উপরিভাগের বা বাহিরে অংশ থেকে পরিষ্কার করিয়ে নিন। 

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কান পরিস্কারের অভিনব পদ্ধতি

কান পরিস্কারের কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে যা জানলে আপনি ঘরে বশেই তা সমাধা করতে পারবেন। কিন্তু সেটি করার আগে আপনাকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হয়ে কাজটি করাই শ্রেয়। নিম্নে কিছু প্রথাগত ঘরোয়া নিয়ম আপনার কান পরিস্কারের সুবিধার্থে তুলে ধরা হ'ল-

ক) বাচ্চাদের কান পরিস্কারে বেবি অয়েল

বাচ্চার মায়েরা বাচ্চাদের যত্নের জন্য নানারকম বেবি প্রসাধনী ব্যবহার করে থাকেন। যার মধ্যে রেয়েছে-বডি ওয়েল, মেসাজ অয়েল, বেবি অয়েল ইত্যাদি। এই সকল অয়েলের নানান গুনাগুণ রয়েছে যা আমরা বিভিন্ন মৌসুমে বাজার থেকে ক্রয় করে থাকি। তবে, কান পরিস্কারের ক্ষেত্রে কিছু বেবি অয়েল রয়েছে যা কানের খইল আপনাআপনি বের করতে কাজে আসে। একটি চিকন ড্রপ দিয়ে আপনার বাচ্চার কানে কয়েক ফোঁটা বেবি অয়েল বাচ্চার বন্ধ হওয়া কানের ভিতরে দিয়ে একটি তুলার বল দ্বারা কিছুক্ষণের জন্য রাখলে কানের মধ্যকার খইলগুলি নরম হতে থাকে এবং এমনিতেই বাইরে বের হয়ে আসতে সহায়তা করে।

খ) লবণ মিশ্রিত পানির সহায়তায় কান পরিষ্কার

যেসকল বাচ্চাদের কানের খইল মনে হয় শক্ত প্রকৃতির তাদের ক্ষেত্রে কানের ভিতরের খইল নরম করতে ও সেগুলিকে অনায়েশে কান থেকে বের হতে লবণ মিশ্রিত পানীয় সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যবহার বিধি মেনেই প্রয়োগ করাই উত্তম।  

গ) ভিনিগার দ্বারা কান পরিস্কার

উপরোক্ত বেবি অয়েল ছাড়াও ভিনিগার দ্বারা কান পরিস্কার একটি সুপ্রাচীন ধরনের পন্থা। আপনি ইচ্ছা করলে এই পন্থাতেও কানের ময়লা অপসারণ করে উপকার পেতে পারেন। কানের সংক্রমণ ঠেকাতেও এই পদ্ধতি খুবই কার্যকরী হতে পারে।

ঘ) গ্লিসারিন প্রসেস

বাচ্চাদের কানের খইল পরিস্কার করতে আরও একটি চমকপ্রদ প্রসেস হল গ্লিসারিন প্রসেস। এই প্রসেসে বাচ্চাদের কানের মধ্যকার খইলকে আলগা করতে এবং গ্লিসারিনের তৈলাক্ততা ও ময়শ্চারাইজিং এর দরুন জমাট বাঁধা শক্ত খইলকে দ্রুত আলগা করতে কার্যকরী মাধ্যম হতে পারে।

ঙ) পানি ও বেকিং সোডা

পানির সাথে খানিকটা বেকিং সোডার সংমিশ্রণে আপনি পেতে পারেন কান পরিস্কারের জন্য উপকারী দ্রবণ। তাই, কানের খইল থেকে মুক্তি পেতে সুপ্রাচীন কালের এই প্রক্রিয়াটিও আপনাকে প্রতিকার দিতে পারে।
অতএব, উপরোক্ত ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো আপনার সন্তানের কান পরিস্কারের ক্ষেত্রে উপকারী মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে সচেতনতার অংশ হিসেবে আপনি উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো  বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

শিশুর কান পরিষ্কারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা কি

একটি শিশুর ক্ষেত্রে কান পরিস্কার করাটি কখনই সহজ সাদ্য হয় না। এর জন্য প্রয়োজন কিছু বাস্তব সতর্কতা। অনেকের ধারণা বাচ্চাদের কান পরিস্কার করাটি মনে হয় খুব সহজ। কিন্তু এটি শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তেমনটি নয়। তাই প্রয়োজন কিছু সতর্কতার পদক্ষেপ। নিম্নে কান পরিস্কারে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ আপনার বাচ্চার উপকারারথে দেখানো হ'ল-

কি করনীয়ঃ 

ক) প্রাথমিক অবস্থায় বাচ্চার দৃষ্টিকে অন্যদিকে অর্থাৎ কোন কিছুর প্রতি ব্যস্ত রাখুন।
খ) একটি পরিষ্কার নরম তোয়ালে নিন।
গ) বাচ্চাদের কানের খইল বেড়িয়ে আসার সাথে সাথে নরম তোয়ালে দিয়ে তা বের করিয়ে নিন। বাচ্চার কানের খইল যদি আঠালো হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

কি করবেন নাঃ

ক) বাচ্চার কানের মধ্যে কোন প্রকার কটন বার্গ অথবা এজাতীয় অন্য কোন বস্তু প্রবেশ করাবেন না।
খ) কোন প্রকার তুলো জাতীয় বাড কানের ভিতরে প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকুন।
গ) কানের অতিরিক্ত খইলগুলিকে পরিস্কার করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ঠাণ্ডা পানি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকুন।
ঘ) কানের ভিতরে প্রেসার দিয়ে কোন প্রকার তরল জাতীয় স্প্রে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
ঙ) ছোট বাচ্চাদের কান এমনিতেই অনেক নরম প্রকৃতির বা মুলায়েম হয়ে থাকে। তাই, কমলমতি বাচ্চাদের কানের খইল সচরাচর পরিস্কার করা থেকে বিরত থাকুন।

শেষ কথা

সুস্থতাই হচ্ছে বড় নিয়ামত। শরীরের প্রতিটি অঙ্গপতঙ্গ সুস্থ রাখতে আমরা সব সময়ই চিন্তিত থাকি। তেমনি কানের পরিচর্যায়, কানের সংক্রমণ রোধে আমদের নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। তাই, বাচ্চাদের কান পরিস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু টিপস যদি কিছুটা হলেও আপনাদের উপকারে আসে তাহলেই আমাদের সার্থকতা। প্রিয় পাঠক, আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন এবং বাচ্চাদের কান পরিষ্কার করা কি ঠিক? কান পরিস্কারের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে বিশদ জানতে পেরেছেন। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলটি আপনার সু-স্বাস্থ্য গঠনের জন্য সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে, এমন আরও স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের মতো বিদায় নিলাম, ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আলোকবর্ষ আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুণ। প্রীতিটি কমেন্ট রিভিও করা হয়।

comment url